বাংলাদেশের নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বর্জ্য নয়, এটি একটি ভুল জায়গায় পড়ে থাকা সম্পদ

মো. জাফর আলম | সোমবার , ১৩ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের নগরসমূহে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো মূলত একটি সনাতন ও অকার্যকর ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, নাগরিকরা তাদের সব ধরনের বর্জ্য একসাথে একটি পাত্রে ফেলবেন, নির্দিষ্ট সময়ে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার কর্মীরা তা সংগ্রহ করবে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলে দেবে। কিন্তু আধুনিক বিশ্ব বহু আগেই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। কারণ বর্তমান বিশ্বে বর্জ্যকে আর ‘বর্জ্য’ বলা হয় না; একে বলা হয় Circular Resource (ঘূর্ণায়মান সম্পদ) বা Misplaced Resource (ভুল জায়গায় পড়ে থাকা সম্পদ)

বাস্তবতা হলো, আমাদের ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার টন মিশ্র বর্জ্য জমা হচ্ছে। সেখানে পচনশীল বর্জ্য থেকে ইঁদুর, মাছি, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্য সংগ্রহ করছে এবং লোকালয়ে বিভিন্ন রোগজীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই মিশ্র বর্জ্যের স্তূপে নেমে প্লাস্টিক, কাগজ, লোহা বা অন্য কোনো ধাতু ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করছেন। অর্থাৎ যে কাজটি ঘরে বা উৎসস্থলে হওয়ার কথা, সেটি হচ্ছে ভাগাড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন খুবই সহজ– “পরিষ্কার করবো একবার, অপরিষ্কার করবো না আর।” অর্থাৎ বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার আগেই তার পরিমাণ কমানো এবং উৎপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পৃথকীকরণ করা। এতে পরবর্তী পর্যায়ে বিশাল ব্যয়ের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যায়।

এখানেই আসে Extended Producer Responsibility (EPR) বা উৎপাদকের সমপ্রসারিত দায়িত্ব ধারণা। একটি কলম কেনার উদাহরণ ধরা যাক। কলমের সঙ্গে একটি কাগজের বাক্স এবং একটি প্লাস্টিক মোড়ক থাকে। অর্থাৎ আপনি কলমের পাশাপাশি দুটি বর্জ্যও কিনছেন। কলম ব্যবহারের আগেই আপনি বর্জ্যগুলো ফেলে দিচ্ছেন, কিন্তু এখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্ব থাকছে না। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই ধারণাকে পরিবর্তন করতে চায়। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের পণ্যের জীবনচক্রের শেষ পর্যায় পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে হবে।

বাংলাদেশে এই ধারণার একটি সফল উদাহরণ হচ্ছে ব্যাটারি শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে দেশের শীর্ষ ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রহিম আফরোজ পুরাতন ব্যাটারি ফেরত দিলে নতুন ব্যাটারি কম মূল্যে বিক্রি করত। ফলে ব্যবহৃত ব্যাটারির শতভাগ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হতো। বর্তমানে প্রায় সব ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

একই ধরনের ব্যবস্থা টায়ার, ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও চালু করা জরুরি। নতুন টায়ার কেনার সময় পুরাতন টায়ার ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেই টায়ার পরিবেশসম্মতভাবে পুনর্ব্যবহার করবে। এর ফলে টায়ার পোড়ানোর মাধ্যমে বায়ুুদূষণ ও বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গমন অনেকাংশে কমে আসবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত হুমকিগুলোর একটি হলো FMCG (Fast Moving Consumer Goods) খাতের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক প্যাকেজিং। পাঁচ টাকার শ্যাম্পু, তেল, মসলা বা অন্যান্য পণ্যের রঙিন প্লাস্টিক মোড়ক কোটি কোটি সংখ্যায় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর অধিকাংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়। রঙিন প্লাস্টিক ও বহুস্তরবিশিষ্ট প্যাকেট শত শত বছর ধরে পরিবেশে থেকে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে। যত ছোট প্যাকেট, তত বেশি মুনাফা এবং তত বেশি দূষণএই বাস্তবতা এখন আমাদের স্বীকার করতে হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রচলিত 3R (Reduce, Reuse, Recycle) ধারণা এখন আরও সমপ্রসারিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে Refuse (অপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রত্যাখ্যান), Regenerate (প্রকৃতি পুনরুদ্ধার) এবং Re-buy (পুনর্ব্যবহৃত পণ্য ক্রয়)। অর্থাৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন শুধু বর্জ্য অপসারণের বিষয় নয়; এটি টেকসই উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থার অংশ।

বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আলোচনায় মেডিকেল বর্জ্য, বর্জ্য (E-waste) এবং অন্যান্য বিপজ্জনক বর্জ্যের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সংক্রামক বর্জ্য, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমিশ্রিত উপকরণ ও রাসায়নিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এগুলো সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মিশে গেলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। একইভাবে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ব্যাটারি ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন ইবর্জ্যে সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামসহ বিভিন্ন বিষাক্ত ভারী ধাতু থাকে, যা মাটি ও পানিদূষণের অন্যতম কারণ। এছাড়া শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, ব্যবহৃত তেল, রং, দ্রাবক এবং কীটনাশকের পাত্রসমূহও বিপজ্জনক বর্জ্যের অন্তর্ভুক্ত। এসব বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্যের মতো ব্যবস্থাপনা করলে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই উৎসস্থলেই এসব বর্জ্যের পৃথক সংগ্রহ, পরিবহন, পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অধিকাংশ নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে এক স্থান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে অন্য স্থানে ফেলে দেওয়া। এটি প্রকৃত অর্থে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, বরং বর্জ্য স্থানান্তর। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রথমে উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ করতে হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানগুলো পুনঃচক্রায়ন, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং দাহ্য বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সবশেষে যে অল্প পরিমাণ বিপজ্জনক বা অবশিষ্ট বর্জ্য থাকবে, কেবল সেটিই স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে যাবে।

বর্তমান ওপেন ডাম্পিং ব্যবস্থার ফলে দুই ধরনের বড় ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, জৈব বর্জ্য পচে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরি করছে, যা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় বহু গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। দ্বিতীয়ত, বর্জ্য থেকে উৎপন্ন লিচেট নামক কালচে তরল মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। ফলে মানুষ টিউবওয়েলের পানি পান করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকছে না।

বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর অধীনে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২২ প্রণয়ন করেছে। এই বিধিমালায় বর্জ্য উৎপাদক, সংগ্রহকারী ও ব্যবস্থাপনাকারী সকল পক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো দেখা যায় না। পরিবেশ অধিদপ্তরকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫এর আওতায় প্রণীত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২২এ উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন এবং পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজভাঙা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১ বিপজ্জনক বজ্যের্র নিরাপদ ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে ইবর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১এ ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক, বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে এবং Extended Producer Responsibility (EPR) নীতির ভিত্তিতে ইবর্জ্য পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, ফলে আইন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত সুফল অর্জিত হচ্ছে না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলো সাধারণ জনগণ। জনগণের আচরণগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো প্রযুক্তি বা প্রকল্পই সফল হবে না। প্রতিদিন একইভাবে বর্জ্য উৎপন্ন হতে থাকলে প্রতিদিনই তা অপসারণ করতে হবে। এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়।

একসময় গ্রামীণ বাংলার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে ছিলো। বাংলায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে জৈব বর্জ্যের জন্য আলাদা গর্ত বা পিট ছিল। সেখানে রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও জৈব বর্জ্য ফেলে প্রাকৃতিকভাবে কম্পোস্ট সার তৈরি করা হতো। সেই সার কৃষিকাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু পলিথিনের আগ্রাসন, রাসায়নিক সারের সহজলভ্যতা এবং নগরায়নের কারণে সেই পরিবেশবান্ধব চর্চা হারিয়ে গেছে।

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের খাল, নালা ও জলাধার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চট্টগ্রামের মতো উপকূলীয় শহরে পরিস্থিতি আরও জটিল। ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং বর্জ্যে ভরাট খালএই তিনের সমন্বয়ে নগরী প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন কেবল পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং জনস্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশকে যদি একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর ভবিষ্যৎ গড়তে হয়, তাহলে বর্জ্যকে আর আবর্জনা হিসেবে দেখলে চলবে না। বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে উৎসস্থলে পৃথকীকরণ, উৎপাদকের সমপ্রসারিত দায়িত্ব, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় ক্রমবর্ধমান নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যই একসময় আমাদের নগরজীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হবে।

যে নগরী তার বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারে, সেই নগরীই টেকসই নগরীতে পরিণত হয়। আর যে নগরী বর্জ্যকে কেবল আবর্জনা মনে করে, একসময় সেই বর্জ্যই তার উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত)

পূর্ববর্তী নিবন্ধড. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী : শিক্ষা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ