অতিরিক্ত কোটায় বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের যথার্থতা প্রমাণ করেছে আফ্রিকা

স্পোর্টস ডেস্ক | রবিবার , ১২ জুলাই, ২০২৬ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয় তখন দলটির তৎকালীন প্রধান কোচ জেনারো গাত্তুসো আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, বিশ্বকাপে আফ্রিকার জন্য বরাদ্দ আসনসংখ্যা অনেক বেশি। তিনি বলেছিলেন, আফ্রিকার জন্য বিশ্বকাপে কম কোটা থাকা উচিত। ৪৮ দলের এবারের সমপ্রসারিত বিশ্বকাপে আফ্রিকার সরাসরি বাছাইয়ের স্থান পাঁচ থেকে বাড়িয়ে নয়টি করা হয়েছে। পরবর্তীতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লেঅফে ডিআর কঙ্গো জয়ী হওয়ায় আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দলে। ৫২ বছর পর ডিআর কঙ্গো আবারও বিশ্বকাপে ফিরে আসে। প্রশ্ন হচ্ছে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দলের মিডফিল্ডার গাত্তুসো কি ঠিকই বলেছিলেন? যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কি আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব অতিরিক্ত ছিল? তিউনিনিশিয়া হতাশাজনক ব্যর্থতা বাদ দিলে আফ্রিকার বাকি প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক দল হিসেবে প্রমাণ করেছে এবং তাদের অংশগ্রহণের যথার্থতা দেখিয়েছে। তিউনিশিয়া প্রথম গ্রুপ ম্যাচের পরই কোচ সাবরি লামুশিকে বরখাস্ত করে এবং তিনটি ম্যাচই হেরে বিদায় নেয়। অন্য নয়টি আফ্রিকান দলই নকআউট পর্বে উঠেছিল। এর মধ্যে পাঁচটি গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে এবং বাকি চারটি সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের তালিকায় থেকে শেষ ৩২এ জায়গা করে নেয়। অর্থাৎ আফ্রিকার সাফল্যের হার ছিল ৯০ শতাংশ, যা ফিফার সব মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা (৮৩.৩৩ শতাংশ), ইউরোপ (৮১.২৫ শতাংশ) এবং সবশেষে এশিয়া (২২.২২ শতাংশ)। তবে নকআউট পর্বে ইউরোপ আধিপত্য বিস্তার করে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের ছয়টি দল উঠলেও আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ছিল মাত্র একটি করে দল। শেষ ৩২ পর্বে আফ্রিকার সাতটি দল বিদায় নেয়। মিসর শেষ ১৬তে পৌঁছায় এবং মরক্কো ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। আফ্রিকান দলগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয় ছিল ম্যাচের শেষ দিকে গোল হজমের প্রবণতা। লিওনেল মেসি, হ্যারি কেন ও আর্লিং হালান্ডের মতো তারকা স্ট্রাইকাররা এর সুবিধা নিয়েছেন। মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনা ৩২ ব্যবধানে জয় পায়, যেখানে সমতাসূচক গোলটি করেন মেসি। হ্যারি কেনের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড কষ্টার্জিত জয় পায় ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে, আর আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে নরওয়ের জয়সূচক গোলটি করেন হালান্ড। অন্যদিকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে নির্ধারিত সময় শেষ হতে পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে দুই গোলে এগিয়ে থাকা সেনেগাল অবিশ্বাস্যভাবে সেই লিড হারিয়ে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচটি হেরে যায়। অনেকেরই ধারণা ছিল, ১০টি আফ্রিকান দলের মধ্যে সেনেগালই সবচেয়ে ভালো করবে। কিন্তু তারা চরমভাবে হতাশ করেছে। চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে হেরে কেবল সেরা তৃতীয় স্থান অর্জনকারী অষ্টম দল হিসেবে শেষ ৩২এ উঠতে পেরেছিল। ‘তেরাঙ্গা লায়ন্স’এর বিদায়ের পর দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মিডফিল্ডার পেপে গুয়ে বলেন, কোচ পেপে থিয়াওকে বরখাস্ত না করা পর্যন্ত তিনি আর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না। শেষ ষোলোতে ম্যাচের ১২ মিনিট বাকি থাকতে মিসর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। এর আগে তাদের আরেকটি গোল বাতিলও করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে আর্জেন্টিনা ৩২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে। টিভি বিশ্লেষক ও সাবেক ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি বলেন, ‘আফ্রিকান দলগুলো খুব তাড়াতাড়ি আত্মতুষ্টিতে ভোগে। সবাই তাদের প্রতিভা ও আবেগের কথা বলে, কিন্তু তারা যখন দুই গোলে এগিয়ে যায়, তখন মনোযোগ কমে যায়।’ তার সঙ্গে বিশ্লেষক হিসেবে থাকা সাবেক সুইডিশ স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলেন, ‘এমন অনেক আফ্রিকান দল ছিল যারা এগিয়ে থেকেও হেরে গেছে। বিশ্বকাপে এটাকে দুর্ভাগ্য বলা যায় না, এটি দুর্বল ম্যাচ ব্যবস্থাপনা।’ কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে মরক্কোর হার দেখিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকান ফুটবল এগিয়ে গেলেও ইউরোপের সেরা দলগুলোর সঙ্গে এখনও বেশ ব্যবধান রয়ে গেছে। ম্যাচের ৮৩ মিনিট পর্যন্ত মরক্কো টার্গেটে কোনো শটই নিতে পারেনি। পরে আজ্জেদিন উনাহির দূরপাল্লার দুর্বল প্রচেষ্টা সহজেই ঠেকিয়ে দেন ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মেইগনান। ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ায় মরক্কো ইতোমধ্যেই পর্তুগাল ও স্পেনের সঙ্গে মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত করেছে। কাসাব্ল্যাঙ্কার কাছে ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার একটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে। মরক্কো সবচেয়ে বেশীদুর গেলেও শেষ ৩২ থেকেই বিদায় নেওয়া কেপ ভার্দে কোটি কোটি দর্শক ও টিভি দর্শকের মন জয় করে। যদিও তারা চার ম্যাচের একটিও জিততে পারেনি। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলের কাছে অবস্থিত মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপদেশটি উদ্বোধনী ম্যাচে স্পেনকে ০০ গোলে রুখে দিয়ে সবাইকে চমকে দেয়। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে শিরোপার অন্যতম দাবিদার স্পেনকে হতাশ করেন। এর প্রভাব ছিল বিশ্বুজুড়ে। তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৫০ লাখে পৌঁছে যায়। শেষ ৩২এর ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দে দুবার সমতা ফিরিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩২ ব্যবধানে হেরে যায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রথম দিনেই হাউজফুল জয়ার ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’