বাল্যবিবাহ: আইনের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়েও কেন থামছে না?

রাজিয়া সুলতানা | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু এসব অধিকারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে যখন একটি মেয়ের শৈশবই অকালে শেষ হয়ে যায়। বাল্যবিবাহ সেই বাস্তবতারই নাম। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যায়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারসবকিছুই একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর বিয়ের ন্যূনতম আইনগত বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের ২১ বছর। এই বয়সের আগে বিয়ে আইনত বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য। তবু বাস্তবচিত্র উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। সংস্থাটি আরও বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার সর্বোচ্চ এবং বর্তমান গতিতে এই প্রথা পুরোপুরি নির্মূল করতে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় লাগতে পারে।

বাল্যবিবাহ কেবল একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা। একটি মেয়ের বিয়ে যত তাড়াতাড়ি হয়, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে মা ও নবজাতকউভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়। UNFPA উল্লেখ করেছে, বাল্যবিবাহ কিশোরী গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এটি অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

প্রশ্ন হচ্ছে, আইন থাকার পরও কেন এই প্রথা টিকে আছে?

এর উত্তর একক নয়। দারিদ্র্য একটি প্রধান কারণ। অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে অর্থনৈতিক দায় কমবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং বা সামাজিক অনিরাপত্তার আশঙ্কায় পরিবার বিয়েকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখে। গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার সীমিত সুযোগ, সামাজিক রীতি, লিঙ্গবৈষম্যমূলক ধারণা এবং পারিবারিক চাপও বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীভাঙন, বন্যা বা জীবিকা হারানোর মতো পরিস্থিতিও অনেক দরিদ্র পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশ সরকার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (National Plan of Action to End Child Marriage 2018–2030) গ্রহণ করেছে। এই কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সরকারের পাশাপাশি ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএ যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এসব কর্মসূচিতে কিশোরীদের জীবনদক্ষতা শিক্ষা, বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা এবং পরিবার ও সমপ্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালে এই যৌথ কর্মসূচির নতুন ধাপ শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশকে সহায়তা করা।

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ বাল্যবিবাহের পেছনে কাজ করে বহু বছরের সামাজিক বিশ্বাস। অনেক পরিবার মনে করে, মেয়ের বিয়ে যত দ্রুত হবে, পরিবারের সম্মান তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনের সম্ভাবনার চেয়ে বিয়েকেই একটি মেয়ের প্রধান ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা হয়। ফলে আইন, প্রশাসন ও সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মেয়ে যদি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার বাল্যবিবাহের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে পরিবার অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল হলে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পায়। এ কারণেই শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাল্যবিবাহের প্রভাব শুধু একটি মেয়ের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। কম শিক্ষিত ও অল্প বয়সে মা হওয়া নারীর সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের একটি চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে। এই কারণেই জাতিসংঘ বাল্যবিবাহকে শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, টেকসই উন্নয়নেরও একটি বড় অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু অগ্রগতির গতি এখনো যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান হারে পরিবর্তন চলতে থাকলে বাল্যবিবাহ নির্মূলে আরও বহু দশক নয়, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। তাই আইনের পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগএই চারটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নারীর অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনায় বাল্যবিবাহ তাই একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কারণ একটি মেয়ের শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎসবকিছুর ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। বাল্যবিবাহ কমানো মানে শুধু একটি আইন বাস্তবায়ন নয়; বরং একটি প্রজন্মকে আরও নিরাপদ, শিক্ষিত এবং সক্ষম হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা।

তথ্যসূত্র:

. UNFPA Bangladesh, Child Marriage

. UNICEF–UNFPA, Global Programme to End Child Marriage

. National Plan of Action to End Child Marriage (2018–2030), নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার

. UNICEF Bangladesh, Bangladesh Government Steps Up Efforts to End Child Marriage (2024)

পূর্ববর্তী নিবন্ধপতেঙ্গায় আমীর খসরুর উপহার সামগ্রী পেল ৬ শতাধিক পরিবার
পরবর্তী নিবন্ধকেন নারীরা রাজনীতিতে আসতে চাইছেন না?