জন্ম হলেই মৃত্যু অবধারিত। এটা মহান আল্লাহপাকের মহিমা। মানবের সন্তান জন্ম হলে সেই শিশুর যেহারে সেবাশুশ্রূষা লাগে তা বয়স বাড়লে তেমন লাগে না। জন্মের সাথে সাথে ঘনঘন প্রস্রাব পায়খানা সে অনুপাতে খাবার অতীব প্রয়োজন। দুধ যেমনে খাওয়াতে হয়, প্রস্রাব পায়খানাও পরিষ্কার করতে হয়। আগেকার আমলে মা–দের অত্যধিক কষ্ট হত, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ছিল না বিধায়। বর্তমানকালে শিশু জন্মের পর প্রস্রাব পায়খানায় ওয়ান টাইম ব্যবহারের জন্য অনেক কিছু উপাদান বের হয়েছে। এসব কিছু উচ্চবিত্ত ধনীদের কল্যাণে। নিম্নবিত্ত গরীবদের জন্য কাপড় ব্যবহার করে শুকানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। আগেকার আমলে মা গর্ভধারণ করলে মহিলা মুরব্বিরা তথা গর্ভধারণীর শাশুড়ি, মা, খালারা অনাগত সন্তানদের প্রয়োজন হবে বিধায় কাঁথাকানি শিশুর জন্য ছোট ছোট কাপড় সেলাই করে উপহার হিসেবে পাঠাতেন।
জন্মের পরপর শিশুদের ৮/১০ বার কম বেশি দুধ খাওয়াতে হয়। তেমনি ৮/১০ বার পায়খানা প্রস্রাব করে থাকে। মায়েরা এসব কিছু অত্যন্ত খুশি মনে করে থাকে শিশুর সেবা যত্ন হিসেবে। এতে মায়েদের বিরক্তি, অস্বস্তি হওয়ার কথা নয়। যেহেতু ৭/৮ মাস মা শিশুকে গর্ভধারণ করে থাকেন। জন্মের সময় মায়ের অস্বাভাবিক কষ্ট। জন্মের পর সবচেয়ে আনন্দিত হয় মা, অতঃপর পিতা। পিতা হয়তো শিশুর প্রয়োজনে খরচ করবে আর্থিক সঙ্গতি মতে। মায়ের কষ্টের সাথে পিতার অবদান তুলনায় আসবে না।
এ জন্য আমাদের রসূল (স.) বলে গেছেন, মায়ের গুরুত্ব অবদান মর্যাদা ৭৫ শতাংশ, পিতার ২৫ শতাংশ। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (র.) একবার আল্লাহর রসূল (স.)কে প্রশ্ন করেছিলেন, মহিলাদের ক্ষেত্রে সবচাইতে অধিকারী মূল্যায়ন, সম্মানের পাত্র কোন ব্যক্তি। উত্তরে বলেছিলেন স্বামী।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (র.) একইভাবে প্রশ্ন করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে কে? আল্লাহর রসূল (স.) বলেছিলেন, মা। অর্থাৎ মহিলার ক্ষেত্রে স্বামী, পুরুষদের ক্ষেত্রে মা। দুনিয়াতে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী মা।
কোন মা শিশু জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত সেবা যত্নে বিরক্তি অস্বস্তি আসবে বলে মনে করি না। হয়ত এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মা থাকতে পারে, তা অতীব স্বল্প সংখ্যক। কিন্তু বর্তমানকালে মায়েদের ক্ষেত্রে আগেকার মায়ের সাথে মনে হয় তুলনায় আসবে না। সন্তান পর্যায়ক্রমে বড় হবে মায়ের আদর সোহাগে বড় হবে, পিতা আর্থিক সঙ্গতি মত খরচ করবে। এভাবে বয়স বাড়তে বাড়তে সন্তান বাস্তব জীবনে পা রাখবে। হয়ত চাকরি করবে বা ব্যবসা করবে। সন্তান বিয়ে করবে, দাম্পত্য জীবনে পা বাড়াবে, সন্তানেরও সন্তান–সন্ততি হবে।
পিতা–মাতার পর্যায়ক্রমে বয়স বাড়তে থাকবে, কমতে থাকবে শারীরিক সক্ষমতা। ৫০/৬০ বছর পার হলে হিতাহিত জ্ঞানও কমতে থাকবে। বয়স ৬৫/৭০ পার হলে শারীরিক সক্ষমতা আরও কমতে থাকবে, বাড়তে থাকবে রোগব্যাধি। প্রয়োজন পড়বে ডাক্তার দেখানো, নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার। লাগবে ঔষধ, আসবে খাবারের পরিবর্তন। তখন পিতা–মাতা পুত্র, পুত্র বধুর উপর নানান দিক দিয়ে নির্ভরশীল হতে থাকবে। সন্তানের বয়স তখন হয়ত ৩০/৪০ বা ৫০। হয়ত ব্যবসা করে হয়ত চাকরি করে। ব্যস্ত জীবন পিতা–মাতার প্রতি সেবাযত্ন দায়িত্ব পালন করা সন্তানের দায়িত্ব। তা সন্তান অস্বীকার করবে না। কিন্তু বাস্তবতা নিরিখে মনের গভীরে কতটুকু উৎফুল্লতা থাকবে। দায়িত্বপালন এক কথা, মনের উৎফুল্লতা ভিন্ন কথা।
একালে অনেক পিতা–মাতার ৫০/৬০ বা ৭০ বছরের ভিতরে বাড়ছে রোগব্যাধি, কমছে শারীরিক সক্ষমতা। ফলে সেবাযত্নের প্রয়োজন পড়বে অত্যধিক। যার চাপ এসে পড়বে সন্তানের উপর। জন্মদাতা পিতা–মাতার কল্যাণে সন্তান যে সেবা করবে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু মনের গভীরে কতটুকু উৎফুল্লতা থাকবে। সন্তানের পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে।
দেশে হাজার হাজার হাসপাতাল ক্লিনিকে ভরপুর। গ্রামেগঞ্জেও ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাড়ছে। উপজেলা সদরে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালে ৫/৭ জন এমবিবিএস ডাক্তার নার্সসহ ২০/৩০ জন স্টাফ রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা সদরে সরকারী হাসপাতালে যথাযথ প্রয়োজন মেটাতে পারছে না বলে বেসরকারী ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করছে। বড় বড় হাট বাজারেও ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। এসব কিছুতে রোগীর কমতি নেই। দেশের হাট বাজারে সরকারী বেসরকারী হাসপাতাল ক্লিনিকে রোগী গিজ গিজ করছে। পিতা–মাতাকে যদি নিয়মিত সন্তানকে হাসপাতালে নেয়া–আনা করতে হয় সন্তানের মন মানসিকতা কি দাঁড়াবে। সন্তান কতটুকু পারবে। সন্তানও ত মানুষ। তার মনের গভীরে হতাশা বিরক্তি যে আসবে না তা বলা কঠিন।
যদি পিতা–মাতাকে ঘরের ভিতর অথবা হাসপাতালে রেখে দিতে হয়। যদি সেবাশুশ্রূষার প্রয়োজন পড়ে তা হলে সন্তানের অবস্থা কী দাঁড়াবে।
অনেক সন্তান পিতা–মাতার সেবা যত্ন করতে অপারগ হলে বৃদ্ধাশ্রমে দিতে বাধ্য হচ্ছে। মানুষ মরণশীল। পিতা–মাতাও ইন্তেকাল করবে। হয়ত শহরের বাসায় অথবা হাসপাতাল ক্লিনিকে। লাশ আনতে হবে, ধৌত করতে হবে, জানাজার ব্যবস্থা করতে হবে। কবরস্থানে কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঠিক করতে হবে অ্যাম্বুলেন্স। লাশ ধৌতের পর নিয়ে যেতে হবে জানাজার মাঠে। জানাজার পর লাশ কবরস্থানে দাফন করতে হবে। মৃত পিতা–মাতার কাপড় পরিষ্কার করতে হবে। রেওয়াজ মতে জনগণকে খাবারের আয়োজন করতে হবে। খরচ ব্যস্ততা কষ্ট জন্মদাতা পিতা–মাতার জন্য হলেও সন্তান মনের গভীর থেকে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে তা ভাববার বিষয়।
সন্তান লালন পালনের চেয়ে পিতা–মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনে আল্লাহপাক ও আল্লাহর রসূল (স.) বারে বারে বলে গেছেন।
বাস্তবতা নিরিখে বৃদ্ধ পিতা–মাতা সন্তানের প্রতি নির্ভরশীল না হতে মহান আল্লাহপাকের দরবারে বেশি বেশি দোয়া করা চাই। বাস্তবতা বড় কঠিন। সন্তানের ব্যস্ত জীবন, স্ত্রী–পুত্র–কন্যার কল্যাণের জন্য দায়িত্বপালনে হিমশিম খাচ্ছেন। পিতা–মাতার জন্য কতই বা করতে পারবে। যদিওবা ইসলাম মতে মেয়ে হলে বিয়ে দিয়ে দেয়া, ছেলে হলে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বপালন। সে দিকে দৃষ্টি দিলে সন্তানের চেয়ে পিতা–মাতার প্রতি দায়িত্ব বহুগুণ বেশি।
সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়া। মেয়েকে সুপাত্রে বিয়ে দেয়া পিতার এতটুকুই দায়িত্ব। কিন্তু বৃদ্ধ পিতা–মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব বিশাল। এক্ষেত্রে পিতা–মাতার চেয়ে তার সন্তানের প্রতি অত্যধিক হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত।
দেশে অহরহ দৃষ্টান্ত রয়েছে পিতা সন্তানের কল্যাণে ন্যায় অন্যায় হালাল–হারাম বাছ বিচার করেনি। সন্তানের কল্যাণে দালান বাড়ি–ঘর, ধন সম্পদ দিয়ে দিতে। কিন্তু বৃদ্ধ পিতা–মাতার এই সন্তান কতটুকুই বা সেবা যত্ন দিতে পারবে।
পিতার জানাজার সময় সন্তান পিতার লাশকে সামনে রেখে দু’টি কথা বলে।
১. ভুল–ভ্রান্তি হলে সন্তান পিতার পক্ষ হয়ে ক্ষমা চায়।
২. কারও সাথে পাওনা বা লেনদেন থাকলে তা দিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় পরিশোধ করবে বলে, যোগাযোগের কথা বলে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ২য়টি সত্য নয়।
বস্তুত পিতা–মাতার বয়স বাড়লে মহান আল্লাহপাকের দরবারে বেশি বেশি দোয়া করা চাই। যাতে ব্যস্ত সন্তান–সন্ততির ওপর রোগব্যাধি, পরবর্তীতে ইন্তেকাল নিয়ে বেশি নির্ভরশীল হতে না হয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।











