মানসম্পন্ন ইটিপির অভাবে ধ্বংসের পথে চামড়া শিল্প!

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ৭ জুলাই, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

চামড়াবাংলাদেশের চরম অবহেলিত একটি পণ্যের নাম। বিশ্বের সব দেশে চামড়ার কদর থাকলেও বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার কোনও কদর নেই। সারাবছর কাঁচা চামড়া বিক্রি করা গেলেও কোরবানির সময় শত শত চামড়া রাস্তাঘাট নদী নালা খাল বিলে ফেলে দিতে হয়।কিন্তু কেন চামড়ার এই দুর্দশা?

গত কয়েক বছরে চামড়া শিল্পের দুর্দশা নিয়ে দৈনিক আজাদীতে ৪৫ বার লিখেছি। শুধু আমি নই দেশের প্রায় সব পত্রিকায় শত শত প্রতিবেদনকলাম লেখা হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। অথচ যারা চামড়া শিল্পের সাথে জড়িত তাদের অভিমতচামড়া শিল্পের এই দুর্দশার একমাত্র কারণ মানসম্পন্ন ইটিপি। বিষয়টি চামড়া শিল্পে জড়িত সবাই জানে, জানে কর্তাব্যক্তিরাও। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় সঠিক ও মানসম্পন্ন একটি ইটিপি স্থাপন করা হয়নি। এই শিল্পের করুণ দশা নিয়ে ব্যবসায়ীরা দোষ দেন আমলাদের আর আমলারা দোষ দেন মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের।

ভেবেছিলাম নতুন সরকারের আমলে চামড়ার দাম নিয়ে ভালো খবর পাবো। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি। যদিও সরকার কোরবানের আগে কাঁচাচামড়া কিনতে লোনের ব্যবস্থা করেছে তবুও কোন ফল পাওয়া গেলো না। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় অর্ধেক বা তারও কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে এবং মাঠপর্যায়ে দাম মনিটরিংয়ের অভাবে মৌসুমী ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। এবার সরকারিভাবে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, বাস্তবে প্রতিটি চামড়া ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। আর ছাগলের চামড়ার প্রতি ব্যবসায়ীদের কোনো আগ্রহই দেখা যায়নি। অন্যদিকে দাম না পেয়ে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চামড়ার মৌসুমী ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারির মালিকেরা বাড়তি দামে চামড়া কিনতে চান না। যদিও ট্যানারির মালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি বরং প্রতিটিতে ৫০৬০ টাকা বেড়েছে।

ট্যানারি মালিকেরা এ বছর ৭৫৮০ লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিলো। যার মধ্যে ঢাকায় কোরবানির চামড়ার প্রায় ৮০% সরাসরি কিনেছেন। এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে ১৬০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন তিন ব্যাংক। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংকও চামড়া কেনার জন্য ঋণ দিয়েছে। পুরোনো ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় অনেক ব্যবসায়ী ঋণ চেয়েও পাননি। ফলে ব্যাংকগুলোও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। ব্যাংকগুলো ঈদে ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার জন্য যে ঋণ দিয়েছে, সেটাকে অপর্যাপ্ত বলছেন ট্যানারিমালিকেরা।

ব্যাংকগুলো জানায়, প্রতিবছর ঈদুল আজহার বেশ আগে থেকে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়মিত করার আবেদন করে থাকেন। চামড়া খাতের ঋণের ৬৫% চলতি মূলধন হিসেবে দেওয়া হয়, যা সারা বছর নেওয়া ও সমন্বয় করা যায়। ৩৫% অর্থ দেওয়া হয় শুধু কোরবানির চামড়া কেনার জন্য। এই নীতিমালার কারণে অনেক ট্যানারী মালিক চাইলেও ঋণ নিতে পারেননি। এদিকে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার (.২৩ বিলিয়ন ডলার)। টাকার অঙ্কে প্রায় ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরের তুলনায় এই খাতে রপ্তানি আয় ৭.% বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ০.৬০%। চামড়ার রপ্তানীজাত পণ্য হলোপ্রক্রিয়াজাত চামড়া (ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদার), চামড়ার জুতো এবং বিভিন্ন চামড়াজাত সামগ্রী (বেল্ট, ব্যাগ, ওয়ালেট ইত্যাদি)। তবে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড বা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সনদের অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে পারে না। উপযুক্ত কমপ্লায়েন্স না থাকায় বেশিরভাগ প্রক্রিয়াজাত চামড়া চীনের বাজারে তুলনামূলক কম মূল্যে রপ্তানি করতে হয়। সরকারি তথ্যমতে, সঠিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স অর্জন করা সম্ভব হলে এই খাত থেকে বছরে ১০১২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা সম্ভব।

তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের এই সনদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৮টি। যদিও বাংলাদেশে প্রায় ২০০টিরও বেশি ট্যানারি বা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে অবস্থিত সচল ট্যানারির সংখ্যা ১৪৭১৪৮টি এবং বাকিগুলো দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সনদবিহীন কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট বিক্রি হয় ০.৮০১ ডলারে এবং সনদপ্রাপ্ত চামড়ার দাম ২.৫ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সেই হিসাবে যদি আমাদের দেশে সবগুলো ট্যানারী সনদধারী হয়, তবে ১.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় অটোমেটিক্যালি ২.৫ বিলিয়ন ডলারে উপনীত হতো। অর্থাৎ শুধু সনদের অভাবে একই পণ্য রপ্তানী করে আমরা প্রায় ১২,০০০১৫,০০০ হাজার কোটি টাকা কম বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছি। একটি মানসম্পন্ন ইটিপি করতে যদি কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচও হয়। তাহলেও একবছরের মধ্যে সেই টাকা উঠে যাওয়ার কথা। প্রশ্ন হলো এতো সহজ হিসাব থাকার পরেও কেন আমরা যুগ যুগ ধরে মান সম্পন্ন ইটিপি করতে পারিনি?

আসলে দেশে সরকারের কাজ হলো জনগণের চাহিদা অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করা। সেই নীতি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা। কোথাও কোনও জায়গায় অনিয়ম দুর্নীতি হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। দেশের সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। দেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ প্রতিরোধ করা। দেশের উৎপাদিত সম্পদের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হওয়া। কিন্তু সরকারের রুটিন ওয়ার্ক হলেও বছরের পর বছর ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়ার দাম না পাওয়া এবং কোরবানির সময় চামড়া রাস্তাঘাট ও ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার পরও সেটি রোধ করতে না পারা সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা। এতে দেশ ও জনগণ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশের চামড়ার উপর নির্ভর করে চায়নাসহ পার্শ্ববর্তী দেশে বহু শিল্প গড়ে উঠেছে। তারা কম দামে কাঁচা চামড়া নিয়ে তাদের শিল্প সচল রেখেছে। অথচ আমরা আমাদের দেশের উৎপাদিত কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার করে ফিনিসড প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারলাম না। তাই চামড়া শিল্প নিয়ে সরকারের ভাবার সময় এসেছে। বিশেষ করে সরকারকে কোরবানির দিন হঠাৎ বেশি কাঁচা চামড়ার (প্রায় ১ কোটি) জোগান সামলানোর পথ বের করতে হবে। সরকারের উচিত হবে (প্রয়োজনে সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কঠোর তদারকির মাধ্যমে) প্রতিটি মাদ্রাসায় সরকারি উদ্যোগে চামড়া কালেকশন করে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। কারণ পচনশীল চামড়া ৮১০ ঘণ্টার মধ্যে লবণজাত করা না হলে, সেটি পচে নষ্ট হয়ে যায়। এটি সফলভাবে করা গেলে পরবর্তীতে সময় নিয়ে প্রক্রিয়াজাত চামড়া যেমন ওয়েটব্লু (Wet-blue leather) ও ফিনিশড লেদার (Finished leather) যেকোনও সময়ে রপ্তানি করা যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রামের প্রত্যয়
পরবর্তী নিবন্ধনকল নয়, শেখার সংকটই আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়