চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার ২ হাজার ২০০ জন ধারণক্ষমতার হলেও বর্তমানে সেখানে কারাবন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬০০ জনে। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দির জন্য ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তিন গুণ বেশি বন্দির চাপ। এই ঘিঞ্জি পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর।
কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমান কারাগার সীমানায় নতুন ভবন নির্মাণের মতো ন্যূনতম জায়গা নেই। অতিরিক্ত বন্দির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকছেই। পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দির কারণে বন্দির সাথে বন্দির চলাফেরার দূরত্ব কম। এতে অপরাধ প্রবণতা একজনের কাছ থেকে অপরজনের কাছে সহজে ছড়িয়ে পড়ছে। সাজা ভোগের পরও অপরাধীর মনোজগতে অপরাধ প্রবণতা থেকে যাচ্ছে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কারাগারে সাজা ভোগ করে বের হওয়া ৫২ শতাংশ বন্দি আবার অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েন। কারাগারকে যদি আধুনিক সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তোলা না যায় সেক্ষেত্রে এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দিদেরকে গাদাগাদি করে রাখা আধুনিক বিশ্বে বেমানান। পৃথিবীর অনেক দেশে কারাগার ছোট হয়ে এলেও আমাদের দেশে কারাগার সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে। এখানে কারাগার সম্প্রসারণ যেমন প্রয়োজন রয়েছে, ঠিক তেমন দ্রুত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি, ছোটখাটো মামলায় আসামির সহজ জামিন লাভ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধীকে সংশোধনের লক্ষ্যে বিকল্প হিসেবে প্রবেশন প্রদানের মাত্রা বাড়াতে হবে। কীভাবে কারাগারে অপরাধী প্রবেশের হার কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে সমাধান বের করতে হবে।
কারাগারের আবাসন সংকট নিরসন করে বন্দিদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বছরের পর বছর নানা তৎপরতা চালিয়েছে চট্টগ্রাম কারাগার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সমস্যার সমাধান আজও দৃশ্যমান হয়নি। সর্বশেষ কয়েক মাস আগে নগরীর কাছে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নতুন একটি কারাগার নির্মাণ করার জন্য ১০০ একর জমি চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন আজাদীকে বলেন, বর্তমানে ধারণক্ষমতার ৩ গুণ বেশি বন্দি রয়েছে চট্টগ্রাম কারাগারে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি সব সময় থাকে। বন্দিদের চলাফেরায় সমস্যা হয়। নতুন কারাগার নির্মাণ করা গেলে ধারণক্ষমতার ৩ গুণ বন্দি সংক্রান্ত সমস্যাটি আর থাকবে না। তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নতুন কারাগার নির্মাণের জন্য ১০০ একর জমি চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছি, জমি পাওয়া গেলেই জঙ্গল সলিমপুরে ২ ইউনিটের আধুনিক কারাগার তৈরি করা হবে।
কারা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কারাগার সম্প্রসারণ করে বন্দিদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কারাগারের ওপর চাপ কমানো। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগ অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বন্দি বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে কাটান। বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে বিনা বিচারে বন্দির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। লঘু অপরাধে অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তি জামিন পাওয়ার যোগ্য হলেও আইনি জটিলতায় বের হতে পারছেন না। জামিন প্রক্রিয়া সহজতর করা গেলে কারাগারের ওপর চাপ কমবে।
বিকল্প শাস্তি বা রিহ্যাবিলিটেশন : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাদণ্ডের বাইরে প্রবেশন বা সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার মতো বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে কারাগার শুধু দণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের মতে, নতুন কারাগার নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং মামলার জট কমানো গেলে বিদ্যমান কারাগারেই বন্দির সংখ্যা সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব। কারাগার সস্প্রসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তারা একে একটি ‘সাময়িক প্রলেপ’ হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম কারাগারের তিন গুণ বেশি বন্দির চাপ কেবল প্রশাসন বা কারা কর্তৃপক্ষের সমস্যা নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ও বিচারিক সংকট উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা যেমন ইতিবাচক, তেমনি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে কারাগারকে কেবল ‘দণ্ড কার্যকরের কেন্দ্র’ হিসেবে রাখার মানসিকতা তৈরিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। ইট–পাথরের দেয়াল বাড়িয়ে বন্দি রাখা সহজ, কিন্তু মানবাধিকার নিশ্চিত করে বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করাটাই এখন সময়ের দাবি।
মানবাধীকারকর্মী ও সিনিয়র আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, আদালতের সংখ্যা, বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এর ফলে বেড়ে যাবে মামলা নিষ্পত্তি। মামলা নিষ্পত্তি বাড়তে থাকলে কারাগারে বন্দির সংখ্যা স্বাভাবিক অবস্থায় চলে যাবে। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দি ঘুমানোর জন্য ৩৬ বর্গফুট জায়গা পাওয়ার কথা। কিন্তু পাচ্ছে মাত্র ৩ ভাগের এক ভাগ। বর্তমান কারাগারে বন্দিরা সংশোধনের সুযোগ পান না। সবগুলো বিষয় আমলে নিতে হবে। আবাসন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে অপরাধ প্রবণতার হার কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সাথে কারাগারে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ দিতে হবে।
কারাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬ হাজার ৬০০ বন্দির বিপরীতে মাত্র ৪শর মতো জনবল রয়েছে। এত কম সংখ্যক জনবল দিয়ে অসংখ্য বন্দির দেখভাল করা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আজাদীকে বলেন, নতুন কারাগার তৈরি হলেই সব রকম সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জমি চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিঠি নিয়ে কাজ চলছে। কীভাবে এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা যায় সে বিষয়টিও দেখছি। জঙ্গল সলিমপুর এলাকার মানুষের বেসিক নিড নিশ্চিত করা, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানের রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সেখানে নতুন কারাগার তৈরিসহ উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করা যাবে।











