বিলেত থেকে ঘুরে এলাম। স্কুল বয়সে বাংলা ব্যাকরণে পড়েছিলাম, ‘বিলাত হইতে ফেরত, বিলাত ফেরত‘, অপাদনে প্রথমা। কত আগেকার কথা, অর্ধ শতকেরও বেশি আগেকার কথা। কিছু কিছু পুরানো কথা যেমন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, তেমনি বাংলা ব্যাকরণের এই অংশটুকু এতদিন পরও মনে গেঁথে রয়েছে। বিলেতে আমার প্রথম যাওয়া নব্বই দশকের একেবারে শুরুর দিকে। খুব সম্ভবত একানব্বই সালে, হল্যান্ড আসার ঠিক বছর খানেক আগে, অর্থাৎ ১৯৯০ সালে। হল্যান্ড এসেছিলাম দিনক্ষণের হিসাবে ১৯৯০ সালের ৮ এপ্রিল। দিনক্ষণ সাধারণত আমার মনে থাকেনা, মনে রাখতে পারিনে। যে কারণে স্কুল বয়সে ইতিহাস পড়তে গেলে গায়ে জ্বর আসতো। পলাশীর যুদ্ধ কবে হয়েছে, কিংবা বাস্তিলের যুদ্ধ কবে শেষ হয়েছে, ভার্সাই চুক্তি কবে কোথায় হয়েছে ইত্যাদি ঘটনা মনে থাকলেও দিনক্ষণ সাল কিছুতেই মনে রাখতে পারতাম না। হল্যান্ড আসার দিন–তারিখ মনে থাকার পেছনে একটি কারণ রয়েছে। তখন আমি ঢাকায় সাংবাদিকতা করি, ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা বাংলাদেশ টাইমসে। আমাদের মাসের বেতন দেয়া হতো প্রতি মাসের ৭ তারিখ। প্রতিদিনকার মত সকালে সেদিন অফিস গিয়েছিলাম। বেতন নিয়ে সে–রাতেই দেশ ছেড়েছিলাম। দেশ ছাড়ার ব্যাপারটা অফিসে ঘনিষ্ট সহকর্মী সৈকত রুশদী ও ফিরোজ আহমদ ছাড়া আর কেউ জানতো না। কাউকে বলিনি। যাই হোক, নব্বই সালে প্রথম বিলেত গিয়েছিলাম সড়ক–পথে, কোচে। খুব এক্সসাইটেড ছিলাম। প্রথম বিলেত যাত্রা। কত পড়েছি, জেনেছি বিলেত সম্পর্কে, সেই স্কুল বয়স থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত– পাঠ্য বইয়ে,পাঠ্যের বাইরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি শেক্সপীয়ার, শেলী, কীটস, এমিলি ব্রন্টি, চার্লস ডিকেন্স, টি এস এলিয়ট– এদের লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, দেখেছি ইংরেজি ছায়াছবি। লন্ডনে নেমে পথ চলতে চেনা–রাস্তা, এলাকার নাম। এর আগে ওদের দেখা মেলেনি আগে, মিলেছিল কেবল বইয়ের পাতায়। যে–দিকে তাকাই, যা দেখি, তাই ভালো লাগে– এমন দশা তখন।
মূল ইউরোপের সাথে ইংল্যান্ডের মাঝখানে সাগর। সেই সাগর পাড়ি দিতে হতো কয়েক তলার ফেরিতে উঠে। হেগ শহর থেকে ছেড়ে যাওয়া কোচ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস হয়ে রওনা দেয় ফ্রান্সের দিকে। বেশ কিছুদূর যাবার পর ক্যালে (ঈধষধরং) ফেরি ঘাট। ফরাসি সীমানায়। সেটি পাড়ি দিলেই ওপারে ইংরেজদের সীমানা, ডোবার (উড়াবৎ)। অনেকের স্বপ্নের দেশ, বাংলার কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইংরেজ–কবি হবার প্রবল বাসনার সোনালী ভূমি। মনে আছে, প্রথমবার বেলজিয়াম পার হয়ে ফ্রান্সের সীমানায় পৌঁছানোর পর আমাদের বাহনটিকে দাঁড় করানো হয়। নিয়মমাফিক ফরাসি ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য কোচে উঠে যাত্রীদের প্রত্যেককে পাসপোর্ট হাতে নিতে বলে। আমার তখনও বাংলাদেশী পাসপোর্ট। মাত্র বছরখানেক হয়েছে হল্যান্ড এসেছি। সাদা চামড়াধারী যাত্রীদের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে, দেখে কিছু না বলে ফেরত দেয়। আমার সবুজ পাসপোর্ট দেখে যেন ‘এই পাইছি‘ গোছের একটা ভাব। পাসপোর্টের এপিট–ওপিট কয়েকবার দেখে ভেতরের পৃষ্ঠা উল্টায়। অনেকটা বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে যেমন মাছকে ওলট–পালট করে দেখা হয় ঠিক তেমনি। মনে মনে বিরক্ত হই, নিজেকে খুব দৈন্য মনে হচ্ছিল। ইমিগ্রেশনের ওই ব্যক্তি আটকানোর মত কিছু না পেয়ে বোধকরি কিছুটা হতাশ হয়ে ফেরত দিলো পাসপোর্ট। আমার সামনের সিটে বসা কৃষ্ণকায় এক যাত্রী। তার পাসপোর্ট তন্নতন্ন করে চেক করলো। তারপর সার্চ করলো তার ব্যাগ। কিছুই না পেয়ে নেমে গেল তারা। আমাদের গাড়ি স্টার্ট দিলো। ভেবেছিলাম ঝামেলা গেল। কিন্তু কদ্দুর চলার পর দেখা গেলো মোটর সাইকেল চড়া এক পুলিশ হাতের ইশারায় কোচটিকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করতে বললো। ইতিমধ্যে সব যাত্রীরা দীর্ঘ পথ–যাত্রায় ক্লান্ত ও বিরক্ত। কেননা হল্যান্ড থেকে লন্ডন পৌঁছুতে ফেরি সহ গাড়ি পথে প্রায় দশ ঘন্টা লাগতো। আবারো সবার পাসপোর্ট চেক এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের ব্যাগ তল্লাশি। তারপর তারা নেমে গেলো। ‘বাঁচলাম‘, মনে মনে এই কথা বলতে না বলতে দেখি ওরা আবার ফিরে এলো। সাথে বিশালাকার এক কুকুর। মানুষ যেখানে নিষিদ্ধ কিছু খুঁজে পেতে ব্যর্থ, সেখানে ভরসা অবলা প্রাণী। কুকুরটি তার মনিবের সাথে একবার এদিক আর একবার ওদিক শুঁকে শুঁকে ফিরে গেলো। কিছু পেলো না। এরপর বাস চালককে বললো, যেতে পারো। গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইংরেজ চালক কৌতুক করে বলে উঠে, ‘কুকুরটা মনে হয় ড্র্যাগস–এডিক্টস। দেখলে না কেমন করে ড্রাগস্ খুঁজছে?’ আমরা সবাই সমস্বরে হেসে উঠি।
আমাদের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো যখন ফ্রান্স সীমানায় ‘ক্যালে‘ নামক স্থানে পৌছুলাম। সেখানে পৌঁছে জানলাম কিছুক্ষণ আগে ফেরি চলে গেছে। আবারো ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী ফেরির জন্যে। যাইহোক, সে সময় আজকের মত ইমিগ্রেশনের তেমন কড়াকড়ি ছিল না। ফেরি পার হয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে নেমে ইমিগ্রেশনের মুখোমুখি হতে হলো। আমার প্রথম লন্ডন যাবার উদ্দেশ্যে ছিল বিবিসি–তে এপয়েন্টমেন্ট। আমস্টারডাম অফিস থেকে ভিসা নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম একা। সাথে নিয়েছিলাম বিবিসি থেকে ডাকযোগে আমার বাসার ঠিকানায় আসা আমন্ত্রণপত্র। সাধারণত চিঠি খুলে লেফাফা ফেলে দেই। কেন জানিনে কী কারণে বিবিসির সেই লেফাফা ফেলে দেয়া হয়নি। ভাগ্যিস ফেলে দেইনি। ইমিগ্রেশন–ডেস্কে বসা ব্যক্তি জানতে চাইলেন কী উদ্দেশে লন্ডন যাওয়া। ‘বিবিসি থেকে আমার আমন্ত্রণ এসেছে‘, বলতেই কর্মকর্তা আমন্ত্রণ পত্র দেখাতে বললেন। তাতে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘এই চিঠির এনভেলপটি কই‘। সেটি বের করে মনে মনে বলি, ভাগ্যিস ফেলে দেইনি, না হলে হয়তো সমস্যা হতো। তখন আমার বাংলাদেশী পাসপোর্ট, সাথে হল্যান্ডে স্থায়ীভাবে থাকার ডকুমেন্ট। সেগুলি দেখে আমার হাতে ফেরত দিয়ে বলে, ‘হ্যাভ আ নাইচ টাইম ইন লন্ডন।’
এরপর বিলেত অনেকবার যাওয়া হয়েছে। নিদেনপক্ষে ১৫/১৬ বার তো হবেই। সড়কপথে সর্বসাকুল্যে যাওয়া হয়েছে দু–বার। কেবল বেড়াতে কখনোই যাওয়া হয়ে উঠেনি। গেছি সম্মেলন কিংবা অন্য কোন কাজ নিয়ে। কখনোবা কাজের ফাঁক–ফোঁকরে কিছুটা ঘোরাঘুরি। অনেকটা ‘রথ দেখা ও কলা বেচার‘ মত। ইতিমধ্যে বছর দেড়েকের মধ্যে ‘সোনার হরিণ‘ নামক ইউরোপীয় পাসপোর্ট হাতে এসেছে। ফলে বিদেশ ভ্রমণে আর কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। কুলীন পাসপোর্টের এই একটা সুবিধে আমেরিকা বলুন আর কানাডা, ইচ্ছে হলো, কাটো টিকেট, ধরো প্লেন, পৌঁছে যাও গন্তব্যে। তবে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে (ব্রেক্সিট) ইমিগ্রেশ–কন্ট্রোল ছাড়াই বিলেত যাওয়ায় সুবিধেটা হারিয়ে যায়। ইউরোপীয় পাসপোর্টে ভিসা লাগেনা বটে, তবে অনলাইনে রেজিস্ট্রি করতে হয়, সামান্য ফি দিয়ে। এবার ঠিক হলো বিলেত যাবো, তবে সমুদ্রের উপর দিয়ে ভেসে না গিয়ে সমুদ্র তলদেশের গভীরে যে দ্রুতগামী ট্রেন ফ্রান্সের ভূমি থেকে এগিয়ে গেছে বিলেতের দিকে, সেই পথ ধরে যাবো। সমুদ্র তলদেশের গভীরে ৩০ মিনিট ধরে দ্রুত গতিতে (১৫৭ কি.মি. ঘন্টায়) চলন্ত–ট্রেনে বসে থাকার মাঝে যে উত্তেজনা ও থ্রিল তা অনুমান করতে গেলেই গা শিরশির করে উঠে। যারা ইতিমধ্যে গেছে তারা বলে, এর আর এমন কী, তুমি টেরই পাবেনা যে তুমি দীর্ঘ ৫৪ কিলোমিটার পথ সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক গভীরে চলেছো। তারপরও সাহসে কুলোয় না। এবার যখন বিলেত যাবার পরিকল্পনা হলো, সহযাত্রী কন্যা সপ্তর্ষি ও তার মা সুমনা ঠিক করলো এই পথ দিয়েই যাবে। কন্যা আগেও গেছে এই পথ দিয়ে। তাই তার কাছে বিষয়টা অতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যেমন এখন আমার কাছেও সমুদ্রের গভীরে বহমান পথ দিয়ে বিলেত–যাওয়া একেবারে স্বাভাবিকের পর্যায়ে পৌঁছেছে, একবার গিয়েই। আকাশ পথে লন্ডন যেতে সময় লাগে ৫০ মিনিট। সময় কম, কিন্তু ঘণ্টা দুই–আড়াই আগ বাড়িয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছানো, লাগেজ দেয়া, ইমিগ্রেশন কন্ট্রোল – সব মিলিয়ে আরো তিন–চার ঘন্টা লেগে যায়। তার উপর প্লেনের টিকেটের দামও বেশি। ট্রেনের টিকেট তুলনামূলকভাবে দামে কম। তার চাইতে বড় কথা অনেক দিন ধরে চাইছিলাম সমুদ্রের নিচ দিয়ে বহমান ট্রেন (ইউরোস্টার) চড়ে একবার যাবো। স্রেফ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে আর মনের ভয়কে জয় করতে।
এবার বিলেত যাবার উদ্দেশ্য একেবারে ভিন্ন। কাজ নয়, বেড়ানোও নয়। সফর সঙ্গী কন্যা, তার মা সুমনা এবং শ্যালিকা পূরবী ও তার কন্যা দীপিকা। দীপিকার ইউনিভার্সিটি ক্লাস থাকায় সে যাবে প্লেনে। লন্ডন পৌঁছে সে মিলিত হবে তার মায়ের সাথে। সপ্তর্ষি তার শহর থেকে এসে আমাদের সাথে যোগ দেবে বন্দর নগরী রটরডাম রেল স্টেশনে। সেখান থেকে ছাড়বে আমাদের লন্ডন–গামী ট্রেন, ইউরো ষ্টার। হেগ শহর থেকে আমি ও সুমনা ভিন্ন ট্রেনে যাবো রটরডাম। বিদেশে গেলে হোটেলে থাকাটা আমার কাছে স্বাচ্ছন্দ্যের। কাউকে পারতপক্ষে ঝামেলা দেবার পক্ষে আমি নই। কিন্তু এবার প্রথমবারের মত থাকা হলো নিপার বাসায়। তার ইচ্ছে আমরা তার বাসায় থাকি। নিপা আমার ছোট বোনের একমাত্র মেয়ে। স্বামী রূপন ও ছোট দুই ছেলে সহ প্রায় বছর দশেক ধরে থাকে লন্ডনে। সেখানে স্থায়ীভাবে থাকে সহোদর প্রকাশ, তার গোটা পরিবার নিয়ে। যাই হোক, সপ্তর্ষি থাকবে তার ডাচ বান্ধবী ও কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী কনির বাসায়। কনি বর্তমানে লন্ডনে গাইনি বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করছে। চমৎকার ইংরেজি বলে কনি। হল্যান্ড–ভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা, ‘বাসুগ‘ বাংলাদেশে গার্মেন্টস কর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরী করেছিল বেশ কয়েক বছর আগে। তাতে কনি ধারাবর্ণনায় তার ভয়েস দিয়েছিল। যে উদ্দেশ্যে আমাদের দল বেঁধে বিলেত যাত্রা সেই দলে যোগ দেবার জন্যে ইতিমধ্যে লন্ডন পৌঁছেছে আরো দু ডাচ। তারা হলো, বেন ও তার স্ত্রী এলভিরা। বেন, পুরো নাম বেন ইয়ংব্লুদ মাস কয়েক আগে হল্যান্ডের টুয়েন্টে (ঞবিহঃব) ইউনিভার্সিটি থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসরে গেছে এবং এলভিরা দীর্ঘদিন কেএলএম—এ কাজ করার পর মাস ছয়েক আগে ভিন্ন এক সংস্থায় যোগ দিয়েছে। ওরা দুজন দিন কয়েক আগেই লন্ডন পৌঁছেছে। আমাদের সাথে যোগ দেবার আগে লন্ডনে ঘুরে বেড়ানোর উদ্দেশে তাদের আগ বাড়িয়ে আসা। পাঠকের নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে হল্যান্ড থেকে এই বিশাল টিমের বিলেত আসার উদ্দেশ্য কী? সে–নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় লেখার ইচ্ছে রইলো। (২১–৬–২০২৬) চলবে।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।












