ফটিকছড়ি উপজেলা চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। এর আয়তন প্রায় ৭৭৩.৫৫ বর্গকিলোমিটার। উপজেলাটি উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত, পূর্বে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পশ্চিমে মিরসরাই–সীতাকুন্ড এবং দক্ষিণে হাটহাজারী দিয়ে ঘেরা। এখানে ১৮টি ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা (ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট) এবং দুটি থানা রয়েছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুসারে জনসংখ্যা প্রায় ৬.৪২ লাখ। বর্তমান উপজেলা সদর অবস্থিত বিবিরহাটে।
সমপ্রতি সরকার ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ১ জুলাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভায় এ বিষয়ে প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নতুন উপজেলার সদর দপ্তর কোথায় হবে, তা নিয়ে ত্রিমুখী বিরোধ দেখা দিয়েছে। ভূজপুর ও হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় নেতৃত্ব সদরের অবস্থান নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক লড়াই চালাচ্ছেন। কেউ ভূজপুর থানার পাশে, কেউ জুজখোলা বা অন্য কোনো স্থানে সদর চাইছেন। এই বিতর্কে আবেগের সঙ্গে ন্যায্যতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। নিজের এলাকায় সদর দপ্তর চাওয়া মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। স্থানীয় প্রশাসনিক সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাও এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু উপজেলা গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো দূরবর্তী জনগণের সেবা সহজ করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। ভূজপুর থেকে বর্তমান সদর বিবিরহাটের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। অন্যদিকে উপজেলার সর্বউত্তর–পশ্চিমাঞ্চলীয় বাগানবাজার ইউনিয়ন থেকে সদরের দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। ভূজপুর থেকে বাগানবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার বা তারও বেশি, যা পাহাড়ি–টিলা অঞ্চলের কারণে যাতায়াতকে আরও কষ্টকর করে। যদি নতুন সদর ভূজপুর বা তার আশপাশে স্থাপিত হয়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকার লাখো মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। চা–বাগান, রাবার বাগান ও সীমান্তবর্তী জনগণের জন্মনিবন্ধন, ভূমি সেবা, আইনশৃঙ্খলাসহ দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। হারুয়ালছড়ির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বর্তমান সদর থেকে তাদের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার, কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন সদর হলে তা ১৮–২০ কিলোমিটার হয়ে যাবে। এমন সিদ্ধান্ত গণস্বার্থের পরিপন্থী।
ফটিকছড়িতে ইতোমধ্যে ভূজপুর থানা রয়েছে। নতুন উপজেলা গঠনের সময় জনসংখ্যা, আয়তন, ভৌগোলিক ভারসাম্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র এক বা দুটি ইউনিয়নের সুবিধার জন্য পুরো উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ সৃষ্টি করা ন্যায়সঙ্গত নয়। আবেগ মানুষকে চালিত করতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় বাস্তবতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। সরকারি জনমত যাচাই, ভৌগোলিক মানচিত্র এবং দূরত্বের বাস্তব তথ্য বিবেচনা করে সদর দপ্তর নির্ধারণ করা উচিত। উন্নয়ন যেন সবার জন্য হয়, শুধু কয়েকজনের জন্য নয়। ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চলের জনগণের স্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত ন্যায্যতা।
লেখক: কলেজ শিক্ষক











