অবকাঠামোগত অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ দুয়ার এবং ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের জন্য হাব। বর্তমানে মিরসরাই বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক মানের শিল্পাঞ্চল বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল। চট্টগ্রামে রয়েছে প্রধান সমুদ্র বন্দর। শিল্প নগর এবং রপ্তানি শিল্পের সূতিকাগার হলেও নতুন শিল্প কারখানা চালু করতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
বর্তমান সরকার সম্প্রতি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছেন। ২০১৬ সালে প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও বিভিন্ন জটিলতার দীর্ঘ সময় ধরে এটি স্থবির হয়েছিল।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) স্থাপনের লক্ষ্যে গঠিত স্পেশাল পারপাস কোম্পানি (এসপিসি) বাংলাদেশ সিইআইজেড কোং লিমিটেড এর সঙ্গে ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট এবং ল্যান্ড লিজ অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি।
সূত্রে জানা গেছে, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর সরকার–টু–সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এপ্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সিইআইজেড কোং লিমিটেড নামে একটি স্পেশাল পারপাস কোম্পানি গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) এবং ৭০ শতাংশ মালিকানা থাকবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) হাতে।
বেজার ৩০ শতাংশ শেয়ার হিসেবে প্রকল্প এলাকায় অধিগ্রহণ করা জমির ৫০ বছরের লিজ মূল্যকে মূলধন হিসেবে গণ্য করা হবে। অন্যদিকে সিআরবিসি তাদের ৭০ শতাংশ অংশীদারির বিপরীতে নগদ মূলধন বিনিয়োগ করবে। এ অর্থ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির যে প্রচেষ্টা চলছে, এই শিল্পাঞ্চল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।’
চায়না অর্থনীতি অঞ্চল ছাড়াও চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত এক বিদেশি উদ্যোক্তার স্বপ্নে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী শিল্পাঞ্চল। কোরিয়ান নাগরিক ‘কিহাক সাং’ এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) এখন শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পের কেন্দ্র নয় বরং সবুজায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের এক নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে। একসময় কৃষিনির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকার চিত্র বদলে দিয়ে কেইপিজেড তৈরি করেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ২ হাজার ৪৯২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে রয়েছে ৪৮টি শিল্পকারখানা। জুতা, পোশাক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি খাতে অবদান রাখছে কেইপিজেড। উৎপাদন শুরুর পর থেকে এখান থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় হয়েছে। পাশাপাশি ২০ লাখের বেশি গাছ রোপণ, ৫২ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় রাখা, জলাধার সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারে কেইপিজেড গড়ে তুলেছে সবুজ শিল্পের একটি মডেল। বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক–কর্মচারীর কর্মস্থল এই শিল্পাঞ্চল, যাদের বড় অংশ নারী। নতুন বিনিয়োগ ও চলমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প, প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কেইপিজেড এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠছে।
১৯৯৯ সালে কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আড়াই হাজার একর জমি বরাদ্দ প্রদান করা হয়। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে জুতা, পোশাক, টেক্সাটাইল ও বিভিন্ন শিল্পাপণ্যের কারখানা। যেগুলোতে উৎপাদন শুরুর পর গত ১৩ বছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এটি দেশের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব বেসরকারি শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই চীনকে বিবেচনা করা হয়। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার প্রধান চীনে সফর করছেন এবং বাংলাদেশে উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ–চীন বিনিয়োগ সেমিনারেও বিপুল আগ্রহের কথা বলা হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীন থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৮৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরে যেখানে চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল প্রায় ৫৭৩০ কোটি টাকা, সেখানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬২০ কোটি টাকায়। এটি শুধু বিনিয়োগ কমার গল্প নয়, এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগ ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ ও কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অনেক দূরের বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সে বিবেচনায় চট্টগ্রামের শিল্প বিনিয়োগের বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু অত্যন্ত করুণ ও ধ্বংসের মুখে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার চট্টগ্রামকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিলেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। খনি থেকে উত্তোলন কমে আসায় এবং এলএনজির সক্ষমতা না বাড়ায় চাহিদার দুই তৃতীয়াংশ গ্যাসও মিলছে না শিল্পাঞ্চলে। যার কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বড় শিল্পনগরী এবং রপ্তানি শিল্পের সূতিকাগার হলেও চট্টগ্রামে নতুন শিল্প কারখানা চালু করতে এবং গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ধুঁকছে চট্টগ্রামের শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে, গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৪১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে নিবন্ধিত বিনিয়োগের এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৫০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। যার বড় কারণ গ্যাস সংকট। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে চান কিন্তু গ্যাস সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ ব্যাংক সুদসহ নানা কারণে পারছেন না। দেশকে ম্যানুফ্যাকারিং হাব বানাতে হলে প্রধান সমুদ্র বন্দরের অবস্থানসহ নানা কারণে চট্টগ্রামকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারখানাগুলো এখানে প্রতিষ্ঠিত হলে রপ্তানি পণ্য পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন উদ্যোক্তারা। তাই গ্যাস সংকট মেটাতে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কূপ স্থাপনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এছাড়াও জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সংকট সমাধানে এখনই স্বপ্লমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।











