আজকাল পরিচিত অপরিচিত অনেক নারীকেই বলতে শুনি, ‘পঞ্চাশ কোনো বয়সই নয় ,বরং কেবল একটা সংখ্যামাত্র এবং নিজের ইচ্ছেমতো স্বাধীনভাবে বাঁচার সম্ভাবনা। নিজের জন্য অনেকটা অবসর যা নিজের মতো করে নিজেকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবা ও জানার সময়। নতুন কিছু শুরু করারও সময়, যা অতীতের ব্যস্ত জীবনে মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল কিংবা থমকে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ভেতরের সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে আবারও জাগানোর সময়।’ এই কথাগুলোর সাথে আমি কিছুটা হলেও দ্বিমত পোষণ করি।
আমার কাছে পঞ্চাশ বছর বয়স কেবল সংখ্যা কিংবা সম্ভাবনা নয়, আরো অনেককিছু। যেমন– মেনোপজের কারণে শারীরিক মানসিক যন্ত্রণা, একাকিত্ব, বিভিন্ন রোগব্যাধি ও মৃত্যুভয়ে সবসময়ই বিষণ্নতায় ডুবে থেকে নিজেকে অনেককিছু থেকে গুটিয়ে ফেলা। এরমধ্যে কোনো কোনো নারীর আর্লি মেনোপজ হলে তো তার যন্ত্রণা হয় মাত্রাতিরিক্ত। দিনদিন শুধু ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ফাইলগুলো ভারিই হতে থাকে। আগে একজনের কর্তৃত্ব সহ্য করে জীবনযাপন করে আসা একজন নারী পঞ্চাশের দ্বার গোড়ায় এসে সন্তানদের কর্তৃত্বটাও বিদীর্ণ হৃদয়ে গোপন ব্যথায় লালন করে অসহায় দৃষ্টিতে নির্বাক তাকিয়ে দেখে।
আমাদের সমাজে শত শত নারী আছে যাদের স্বামী সন্তানেরা মেনোপজের যন্ত্রণাদায়ক লক্ষ্মণগুলো কী এবং কেমন হয় তা বোঝেই না। উল্টো মেনোপজের কারণে তাদের আচরণের পরিবর্তনকে নির্মমভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। নারীর খিটখিটে মেজাজ, অহেতুক মন খারাপ, চুপচাপ থাকা, হঠাৎই তীব্র গরম লাগা, হাত পা জ্বালা করা, আবার হঠাৎ শীত লাগা, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঠোঁট ও জিব শুকিয়ে যাওয়া, অকারণে কান্না পাওয়া এবং ঘরকোণো হয়ে পড়া, রাতে সমস্ত শরীরের ব্যথায় ঘুমাতে না পারা, সাংসারিক কাজে অনীহা, কিছুই ভালো না লাগা এবং সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কিছুও দিব্যি ভুলে যাওয়ার মতো জটিলতা নিয়ে নারীজীবনে আসে পঞ্চাশ বছর বয়স। এমতাবস্থায় স্বামী সন্তানের সহমর্মিতা ভীষণভাবে প্রয়োজন। অথচ, বেশিরভাগ স্বামী সন্তানেরা সহমর্মিতা না দেখিয়ে স্ত্রী কিংবা মা‘কে ভুল বোঝে রূঢ়ভাষায় কটুকথা বলে কষ্ট দিয়ে একাকিত্ব ও তীব্র বিষণ্নতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। শারীরিক যন্ত্রণাগুলো তখন মানসিক অসুখে পরিণত হতে খুব বেশি সময় নেয় না। তবে হ্যাঁ, সমাজের চারভাগের একভাগ নারী হয়তো পঞ্চাশ বছর বয়সটাকে কেবল সংখ্যা ও সম্ভাবনা ভেবে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ পায়। কারণ, তাদের পরিবার এবং প্রিয়জনেরা নিশ্চয়ই শিক্ষিত, সুশীল ও মুক্তমনা প্রকৃতির মানুষ। বাকি তিনভাগ নারী সেই সুন্দর সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত হয়। পরিশেষে বলবো, ‘পঞ্চাশ কেবল বয়স নয় বরং একটি সংখ্যা ও নতুন করে বাঁচার সম্ভাবনা’ এই সুন্দর উক্তিটি সার্বিকভাবে বলার আগে আমাদের সমাজের চারপাশে বিচক্ষণতার সাথে চোখ বুলিয়ে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের সমীকরণে হিসাব মিলাতে গিয়ে কেবল সংখ্যা ও সম্ভাবনার চেয়ে হতাশা এবং কষ্টের বার্তাই বেশি গোচরীভূত হয়।












