একবছর আগে নগরে মনোরেল নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে মিশরের দুই প্রতিষ্ঠান ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’–এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এতে প্রতিষ্ঠান দুটির ‘চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ’ পরিচয়ে স্বাক্ষর করেন কাউসার আলম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। তবে গত সোমবার ঢাকাস্থ মিশরীয় দূতাবাস বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পত্র দিয়ে জানায়, কাউসার আলম চৌধুরী প্রতিষ্ঠান দুটির ‘অনুমোদিত’ কোনো প্রতিনিধি নন।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার মনোরেল নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক চুক্তিটি (এমওইউ) বাতিল করে চসিক। বিষয়টি আজাদীকে নিশ্চিত করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
জানা গেছে, গত বছরের ১ জুন সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। ওইদিন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা বলা হয়। সরকারি–বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় মনোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি’তে এনএএস ইনভেস্টমেন্ট ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইজিপ্টের মাধ্যমে বিনিয়োগ করারও কথা বলা হয় সেদিন। পরবর্তীতে এমওইউ–এর বিষয়টি একই বছরের ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) অবহিত করে চসিক। এতে প্রকল্পে বাস্তবায়নে বিডার অনুমোদন চাওয়া হয়। সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগে কোনো প্রকল্প প্রস্তাব এলে তা খতিয়ে দেখে বিডা। এক্ষেত্রে বিডা ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’ সম্পর্কে কোনো খোঁজ–খবর নেয়নি। বরং ১০ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতা করতে বলা হয়। যার অনুলিপি দেয়া হয় কাউসার আলম চৌধুরীকেও। ফলে কাউসার আলম চৌধুরী আদৌ ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’–এর প্রতিনিধি কিনা তা কেউ সন্দেহ করেনি।
এদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’–এর পরিচয়ে সম্ভাবত্য যাচাইয়ে ফিল্ড সার্ভে শুরু করে নগরে। একইদিন টাইগারপাস নগর ভবনে উপস্থিত কাউসার আলম চৌধুরী বিষয়টি মেয়রকে অবহিত করেন।
অতঃপর মিশরীয় দূতাবাসের পত্র : গত সোমবার (২২ জুন) ঢাকাস্থ মিশরীয় দূতাবাস বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি পত্র দেয়। এতে বলা হয়, কাউসার আলম চৌধুরী নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে আরব কন্ট্রাক্টরস (ওসমান আহমেদ ওসমান অ্যান্ড কোং) এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন পিএলসি, বা ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’ নামে অভিহিত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।
পত্রে বলা হয়, আরব কন্ট্রাক্টরস এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন উভয়ই দূতাবাসের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে, প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে কাউসার আলম চৌধুরীর কোনো চুক্তিভিক্তিক, প্রতিনিধিত্বমূলক, এজেন্সি, অংশীদারিত্ব বা অন্য কোনো অনুমোদিত সম্পর্ক নেই। এমনকি কাউসার আলম চৌধুরীর আরব কন্ট্রাক্টরস এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন পক্ষে কাজ করতে, আলোচনা করতে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে, প্রকল্প প্রচার করতে বা প্রতিশ্রুতি দিতেও অনুমোদিত নন।
মিশরীয় দূতাবাসের দেয়া পত্রে আরব কন্ট্রাক্টরস বা ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের পক্ষে কোনো যোগাযোগ, প্রস্তাব, সমঝোতা স্মারক করা হলে তা বিবেচনার আগে অফিসিয়াল চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি স্ব স্ব কোম্পানির সাথে যাচাই করে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।
মিশরীয় দূতাবাস তাদের পত্রের সঙ্গে অতিরিক্ত তথ্যও দেয়। এতে বলা হয়, কাউসার আলম চৌধুরী কর্তৃক প্রচারিত চসিকের মনোরেল প্রকল্প ও খুলনায় প্রস্তাবিত ৬০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাথে আরব কন্ট্রাক্টরস এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে কোম্পানিগুলো নিশ্চিত করেছে। ফলে কোম্পানিগুলোর নামে কাউসার আলম চৌধুরীর সমাঝোতা স্মারক এর দায়ভার প্রতিষ্ঠানগুলো নেবে না। কাউসার আলম চৌধুরীতে সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে আরব কন্ট্রাক্টরস এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন যে অনুমোদন দেয়নি তা আনুষ্ঠাসিকভাবে চসিককে অবহিত করতে বলা হয়।
এদিকে ঢাকাস্থ মিশরীয় দূতাবাস থেকে পত্র পাওয়ার তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিডাকে চিঠি দেয়। গতকাল বুধবার যা চসিককে জনানো হয়। এরপর চসিক সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) বাতিল করে।
চুক্তিবাতিল করে চসিকের ইস্যু করা চিঠিতে বলা হয়, আরব কন্ট্রাক্টরস এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশন– এর প্রতিনিধি হিসেবে দাবিকৃত কাউসার আলম চৌধুরী এর সাথে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এমওইউ’টি বাতিল করা হল। এ বিষয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, যানজট নিরসনের পাশাপাশি নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন হিসেবে মনোরেল নির্মাণের প্রস্তাব আসার পর নগরবাসীর কথা বিবেচনা করে আমরা এমওইউ করি। তাও প্রকল্পের সম্ভাব্যত্য যাচাইয়ের জন্য। সেখানে আমাদের কোনো অর্থ খরচ হয়নি। আমরা মনে করেছিলাম, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নের উপযোগিতা থাকলে সরকারের মাধ্যমে অগ্রসর হব। তাই প্রাথমিকবভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এমওইউ করার পর তা বিডাকে অবহিত করি। বিডা আপত্তি জানালে আমরা অগ্রসর হতাম না। মনোরেল ছাড়াও বিদেশি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান নানা প্রকল্পের প্রস্তাব করে। অনেকের সাথে এমওইউ হয়, সেটাও মন্ত্রণালয়কে জানায়। তাছাড়া এখানে সিটি কর্পোরেশনের কোনো অর্থ খরচ হয়নি।












