ফুট ওভারব্রিজের কংক্রিটে মুছে যাবে অধ্যাপক খালেদ চত্বর!

যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে চত্বরটি বাঁচিয়ে ফুট ওভারব্রিজ করা সম্ভব বলে মনে করেন নগরবাসী

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ২৩ জুন, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ চত্বর। যে চত্বরে থাকা সবুজ বাগানটি বছরের পর বছর পড়ে ছিল চরম উপেক্ষায়। সেখানে অযত্নে গজিয়ে ওঠা আগাছাগুলো যেন অনেক আগেই চত্বরটির মলিন ভবিষ্যতের জানান দিচ্ছিল। এবার সেই ক্ষতে শেষ পেরেকটি যেন ঠুকে দিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। সবুজ বাগানের সেই বুকে সংস্থাটি এখন সগৌরবে বসাচ্ছে ফুটওভার ব্রিজের কংক্রিটের ভারী পিলার।

এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে নগরবাসী বলছেন, উন্নয়নযজ্ঞের নিচে চাপা পড়ে হয়তো চিরতরে মুছে যেতে চলেছে অধ্যাপক খালেদ চত্বর। উন্নয়নের চাকা ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু তার নিচে পিষ্ট হয়ে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ‘খালেদ চত্বর’এর নাম ও স্মৃতি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে একটি চত্বরের এমন নিঃশব্দ বিদায় মেনে নিতে পারছেন না নগরবাসী। যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে চত্বরটি বাঁচিয়েও ফুটওভার ব্রিজ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ চত্বরের অবস্থান নগরের জিইসি মোড়ের সেন্ট্রাল প্লাজার সামনে। ২০১২ সালের ৬ জুলাই এ চত্বরের উদ্বোধন করেন তৎকালীন সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি ফোয়ারাও। এছাড়া একটি স্মৃতিফলকও দেয়া হয়। স্মৃতিফলকটিতে লেখা ছিল-‘বিবেকের বাতিঘর, বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য, সাবেক এমপি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার গর্ভনর, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ স্মরণে’।

পরবর্তীতে ২০২১ সালে ওই চত্বরকে ঘিরে সৌন্দর্যবর্ধনে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে চসিক। প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে ফেলে ফোয়ারা। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ড বসায়। এছাড়া অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের স্মৃতি ফলকটি সরিয়ে ফেলে। নগরবাসী এর সমালোচনা করলে তৎকালীন মেয়র চত্বরটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত দেন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত চসিকের সাধারণ সভায়। এরপর বাগান করা হয় এ চত্বরে। সময়ের পরিক্রমায় অযত্নেঅবহেলায় সৌন্দর্য হারায় সেটি। এ অবস্থায় নগরবাসীর দাবি ছিল, চত্বরটির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা হোক। বাস্তবে হচ্ছে উল্টো।

জানা গেছে, আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জিইসি মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ বা পদচারী সেতু নির্মাণ করছে চসিক। ৫ কোটি ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ ফুটওভার ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর করা হয় ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি। মাঝখানে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফুটওভার ব্রিজটির নির্মাণ কাজে সম্প্রতি গতি পেয়েছে। ওই ফুটওভার ব্রিজের একটি পিলার বসানো হচ্ছে খালেদ চত্ত্বরে। এছাড়া ভবিষ্যতে কাজ শেষে পুরো চত্বরটিই ফুটওভার ব্রিজের নিচে চাপা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজটিতে ওঠানামার জন্য চারটি সিঁড়ি থাকবে। জিইসি কনভেনশন, জামান হোটেল, কামাল স্টোর ও সেন্ট্রাল প্লাজার সামনে থাকবে সিঁড়িগুলো। কামাল স্টোরের সামনের সিঁড়ির পিলার বসানো হচ্ছে খালেদ চত্বরের বাগানের ভেতর।

জানা গেছে, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ (৬ জুলাই ১৯২২২১ ডিসেম্বর ২০০৩) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সবাদপত্র দৈনিক আজাদীর প্রয়াত সম্পাদক। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ, চেতনার বাতিঘর, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। চট্টগ্রামের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ অধ্যাপক খালেদ চট্টগ্রামের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শত নাগরিক কমিটি গঠন করে দল মত নির্বিশেষে সকলকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। তিনি দৃঢ়চেতা ও ধার্মিক ছিলেন। অসামপ্রদায়িক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার আন্দোলনে সব সময় সক্রিয় ছিলেন। তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তার অবদান তুলে ধরতে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ চত্বরটি গড়ে তোলে চসিক। সেটার বেহাল দশা দেখে তার নিকটাত্মীয় ব্যাংকার শাহরিয়ার পারভেজ শাকিল আজাদীকে বলেন, উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু সেটা কেন সবসময় আমাদের ইতিহাস আর স্মৃতিকে মুছে দিয়ে করতে হবে? যে চত্বরটি বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে রইলো, সেটাকে সংস্কার না করে এখন সেখানে পিলারের কংক্রিট ঢালাই দেওয়া হচ্ছে। এটা মানা যায় না। যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে চত্বরটি বাঁচিয়েও ফুটওভার ব্রিজ করা সম্ভব ছিল।

তানভীর নামে এক পথচারী আজাদীকে বলেন, দারুণ এক কৌশল। প্রথমে একটা চত্বরকে রক্ষণাবেক্ষণ না করে আগাছার জঙ্গল বানাও, তারপর এখানে তো কিছু নেই অজুহাতে পিলার বসিয়ে তার নাম নিশানা মুছে দাও। চত্বরটির দেখভাল করার লোক পাওয়া না গেলেও, তা ধ্বংস করার লোকের অভাব হয় না।

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সন্তান ও সাপ্তাহিক স্লোগান সম্পাদক মোহাম্মদ জহির আজাদীকে বলেন, সিটি মেয়রের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে চত্বরটি যেন রক্ষা করা হয়। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শুধু আমার বাবা নন, তিনি এ চট্টগ্রামের অহংকার। তার নামে থাকা চত্বর সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার অবদান সম্পর্কে জানবেন এবং অনুপ্রেরণা পাবেন।

এ বিষয়ে চসিকের চসিকের চসিক মোহম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন করে চত্বরটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি জেটির যন্ত্রে আগুন
পরবর্তী নিবন্ধএলেন যুক্তরাজ্য থেকে, ১০ বছর পর ছেলেকে বুকে নিলেন মা