অদম্য শামসুন্নাহার রহমান পরাণ

রেজাউল করিম | রবিবার , ২১ জুন, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

সমাজবদ্ধ ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষের কর্মদক্ষতা, কার্যাবলি সমাজকে প্রভাবিত করে। তবে সবার কার্যক্রম সমাজকে প্রভাবিত করে না। একটি দেশের উন্নয়নমূলক কাজ, সামাজিক সংস্কার, কর্মসংস্থানসহ সব ধরনের সমস্যার সমাধান করা এককভাবে সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজে বসবাসকারীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসেন শামসুন্নাহার রহমান পরাণ।

শামসুন্নাহার রহমান পরাণ ১৯৪০ সালে ১ জুন চট্টগ্রামের এনায়েতবাজারস্থ মাতুতালয় মায়া কুটিরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা মরহুমা সাজেদা খাতুন এবং বাবা মরহুম মৌলভী আমির হোসেন মজুমদার। কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দিঘি ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত সূফি পরিবারের সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন তৎকালীন ঋণ সালিশী বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সম্মানিত জুরি বোর্ডের সদস্য। অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। শামসুন্নাহার রহমান পরাণ চার সন্তান নিয়ে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়াশিংটনের সেডপা (সিইডিপিএ) থেকে ব্যবস্থাপনায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি গ্রহণ করেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ভাষা আন্দোলনে বড়দের সাথে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। শামসুন্নাহার রহমান পরাণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালে চট্টগ্রামে বন্দুক চালনা ও ফাস্টএইড প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁর দুই ভাই বীরপ্রতীক মেজর জেনারেল সায়ীদ আহমেদ, অপরজন যুদ্ধাহত আবুল কাশেম মজুমদার বীর মুক্তিযোদ্ধা।

শামসুন্নাহার রহমান পরাণ এনজিও সেক্টরের একজন পথিকৃৎ। তিনি সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত নারী ও নিষ্পাপ শিশুরাই ছিল পরাণ রহমানের ঘাসফুল। তিনি তাদের কাছে টেনে নিলেন পরম মমতায়। ক্ষুধার্ত শিশু ও অসহায় মানুষের জন্য তিনি প্রতিদিন রুটিসবজি নিয়ে হাজির হতেন। এই কাফেলায় অন্য মেয়েদের সঙ্গে বড় মেয়ে পারভীন মাহমুদও ছিলেন।

শামসুন্নাহার রহমান পরাণ নিজেই একটি সংগঠন। তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র বহুমাত্রিক। ড. মনজুরউলআমিন চৌধুরী যিনি প্রাবন্ধিক ও গবেষক। তাঁর সম্পাদনায় চলতি বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘শামসুন্নাহার রহমান পরাণ স্মারকগ্রন্থ।’ ৩৭৫ পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোহাম্মদ আরিফ। ঘাসফুল প্রকাশনার এই গ্রন্থের দাম রাখা হয়েছে ৭শ’ টাকা। স্মারকগ্রন্থে লিখেছেন, . মুহাম্মদ ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদ, . সালেহ উদ্দিন আহমেদ, এম এ মালেক, . মনজুরউলআমিন চৌধুরী, এ এইচ এম নোমান, রফিক আহমেদ, খুশী কবির, শাহীন আনাম, মালেকা খান, . ওয়াহিদা বানু, অ্যাডভোকেট সালমা আলী, . মো. আরিফুর রহমান, জেসমিন প্রভা, সামছুল হক, রেহেনা পারভীন, অ্যাঞ্জেলা গোমেজ, শিহাব উদ্দিন আহমদ, মো. ফয়জুল কবীর, ফেরদৌস আরা বেগম, ডনাই প্রু নেলি, রুশো মাহমুদ, দিল মনোয়ারা মনু, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, সিরাজুল করিম মানিক, ডেইজী মউদুদ, সাইফ উল আলম, এ এইচ এম ফয়সাল, ছালেহা বেগম, চন্দন চক্রবর্তী, . এম এ সাত্তার মণ্ডল, . মো. আবদুল করিম, প্রফেসর মো. হাফিজুল ইসলাম, জওশন আরা রহমান, বেগম শামসুজ্জাহান নূর, . জয়নাব বেগম, প্রফেসর রীতা দত্ত, শীলা মোমেন, কবিতা বড়ুয়া, শাহানা মোজাম্মেল, রোকেয়া চৌধুরী, নেছার আহমদ, ডা. দেবলা মল্লিক, জিনাত আজম, লায়ন হাসিনা খান, রওশন আরা ইউসুফ, জাহান আখতার হোসাইন, জমির আহম্মদ সর্দার, রওশন আরা মোজাফফর (বুলবুল), আইভি হাসান, সাফিয়া রহমান স্বাতী, আবদুল কাদের, প্রফেসর ড. গোলাম রহমান, পারভীন মাহমুদ, জেসমিন আক্তার বাপ্পী প্রমুখ।

ঘাসফুল নামের যথার্থতা নিয়ে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘এটা শুধু ঘাস নয় তার মধ্যে ফুল, সেটাতে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। ঘাসের মধ্যেও যে ফুল হতে পারে এটিই তাকে আকর্ষণ করেছিলো, তার কাছে মনে হলো ঘাসের মধ্যেও যে ফুল আছে সেগুলোকে আমি ফুটাবো। সেটিই সে করেছে একেবারে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে করেছে।’(স্মারকগ্রন্থ পৃষ্ঠা ৩৫)। অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মতে, ‘আমি যখন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ছিলাম তখন ঘাসফুল নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী প্রধান হিসেবে আমি তার কার্যক্রম অবলোকন করি।’ (স্মারকগ্রন্থ : পৃষ্ঠা ৩৮)। কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী ছিলেন পরাণ। নারীনেত্রী খুশী কবির লেখেন, ‘কখনোই নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা তাঁর ভিতরে দেখিনি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, যে কাজটি তিনি করছেন নিজের ব্যক্তি ইমেজের থেকে সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ (স্মারকগ্রন্থ : পৃষ্ঠা ৪৫)। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী, ক্লান্তিহীন ছিল তাঁর পথচলা। দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক লিখেন ‘শামসুন্নাহার রহমান পরাণ একজন বহুমাত্রিক মানুষ। তিনি জীবনের হীরন্ময় সময়গুলো কাটিয়েছেন মানুষের কল্যাণে। নারীর সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার সর্বোপরি মানুষ হিসেবে নারীর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন।’(স্মারকগ্রন্থ : পৃষ্ঠা ৭৯)

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। রাস্তা নেই, ঘাট নেই। শুধু নেই আর নেই। রাষ্ট্রের একার পক্ষে দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড পৃথিবীর মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয়। এমন এক অবর্ণনীয় বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে পরাণ রহমান ঝাঁপিয়ে পড়লেন রিলিফওয়ার্কে। তিনি পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে অসহায় দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনকল্পে কাজ শুরু করেন। যাত্রা শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের। পরাণ রহমান তাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখান। পরাণ রহমান বিভাজন থেকে বন্ধনকে আবিষ্কার করতেন বেশি এবং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন অনেক মানুষকে। তিনি বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালসহ নারী উন্নয়নযাত্রার মহীয়সী নারীদের এক সার্থক প্রতিনিধি। পরাণ রহমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সূচনা করেছিলেন চট্টগ্রামে, যা আজ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। উন্নয়নযাত্রার সহকর্মী হিসেবে তার স্মৃৃতি, উপদেশ, মমতা এখনো আমাদের হৃদয়ে অমলিন। অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার ২০২১ সালে শামসুন্নাহার রহমান পরাণকে বেগম রোকেয়া পদক পদক প্রদান করে। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মহিয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। আমৃত্যু তিনি নারী উন্নয়ন ও মর্যাদা রক্ষায় ছিলেন সচেষ্ট। শুধু ঘাসফুল নিয়ে পড়ে থাকেননি, তাঁর সাহিত্যেরও ভাণ্ডার নেহায়েত কম নয়। অনেক অজানা তথ্য গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। স্মারকগ্রন্থটি সুখপাঠ্য এবং পাঠকদের উজ্জীবিত করবে নিঃসন্দেহে।

লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ