সম্প্রতি এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে ঐ বাড়ির কর্তারা তাদের বৈঠকখানায় বসার আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে বসি। ঐ বৈঠকখানার বুক শেলফ আমার নজর কাড়ে, নানা রকমের বই, দেখে মনে হয় খুব একটা পড়ে না কেউ। বুক শেলফে চোখ বুলাতে বুলাতে ভাবি যিনি বইগুলি সংগ্রহ করেছেন তিনি হয়ত গত হয়েছেন অথবা দূর কোনও দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই তার বইগুলির যত্ন করার তেমন কারো গরজও হয়ত নেই। অনুসন্ধিৎসু হয়ে জানতে চাইলে বাড়ির ছোট ছেলে জানান বইগুলি তার বাবা সংগ্রহ করেছিলেন, তিনি প্রায় পনের বছর আগে মারা গেছেন। বুঝে নিই সেই থেকে তার অর্থ সম্পদের প্রতি ছেলেমেয়েরা যত্নবান হয়েছেন বইগুলির প্রতি তেমন নয়। এটি শুধু এই বাড়ির কাহিনী নয় এটি আমাদের অনেক বাড়ির।
ঐ বাড়ির বুক শেলফ থেকে আমি একটি বই নিই। বইটির ধূলাবালি মুছে আর শেলফে না রেখে নিজের কাছে রেখে দিই, অনুষ্ঠান শেষান্তে নিজ বাড়িতে ফেরত যাত্রায় বইটি পড়া শুরু করি, বইয়ের নাম ‘ফ্রম দি কিংডম অব মেমোরি’ লেখক ‘এলি ওয়েসেল’ ভদ্রলোক ১৯৮৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। নোবেল কমিটি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে এলি ওয়েসেলকে ‘শান্তির দূত’ ঘোষণা করেন। এই এলি ওয়েসেল তার বর্ণিত বই ‘ফ্রম দি কিংডম অব মেমোরি’ তে তিনি কেন লিখেন তার উল্লেখ করতে গিয়ে স্যামুয়েল ব্যাকেটকে উদ্ধুত করেছেন, ব্যাকেট বলেছেন, মানুষের সাথে যোগাযোগের অন্য কোনও পথ না পেয়ে লেখালেখি। মননশীল ইহুদি সাহিত্যিক কবি ‘আরন জেটলিন’ তার লেখার কারণ মৃত আত্মীয়, বাবা মা, বন্ধুবান্ধব তাদের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের নিমিত্ত হিসাবে, তিনি অনুভূতি প্রবন হয়ে উল্লেখ করেছেন ‘You have abandoned me, you are together, without me. I am here alone. And I make words’. অর্থাৎ ‘তোমরা আমাকে ছেড়ে গেছ, আমাকে ছাড়াই তোমরা ঐ পাড়ে সবাই একত্রিত, আর আমি একাকী লেখালেখিতে মগ্ন’। আলবার্ট ক্যামুর কাছে লেখালেখি এক ধরনের উপাসনাতুল্য। আর ‘এলি ওয়েসেল’ উল্লেখ করেছেন, তাকে লেখালেখিতে মগ্ন করে নিস্তব্ধতা। এলি ওয়েসেল এর এই নিস্তব্ধতা আমাকেও দারুনভাবে সংক্রমিত করে। সংক্রমণের আধিক্য আমাকে লেখালেখির জগতে টেনে নেয়।
নিস্তব্ধতার হাওয়া গাজার অভুক্ত শিশুদের কান্না আমার কানে বাজায়, নিদারুণ বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত শহরের শত শত ইমারতের ইট পাথরের নিচে চাপা পড়া মানুষের অসহায়ত্ব আমার কাছে দুর্বিষহ এক যন্ত্রণা বয়ে আনে, ইসরাইলী সৈন্যদের ছত্রছায়ায় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের চাষের ফসল যখন ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা জোর করে লুট করে নিয়ে যায়, বাধা দিতে গেলে অবুজ সন্তান সন্ততিদের সামনে মা বাবাকে বেধরক মারধর করা, সামরিক যানের পিছনে বেঁধে অন্যায়ের প্রতিবাদকারী ফিলিস্তিরিদের রাস্তায় ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া, তাও নিস্তব্ধতা আমার কাছে বহন করে আনে। ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে’ এখানেই ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’।
নাগা লেখক ‘আও’ এর বাক্যটি আগেও আমি আমার কোন লেখায় উল্লেখ করেছি, আবারো পুনরাবৃত্তি করছি ‘কনফ্লিক্ট গিভস নাথিং বাট ক্যাজুয়ালিটিজ’ সংঘাত সংঘর্ষ হত্যা আর ধ্বংস ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। আও এর এ অসাধারণ বাক্যটি বর্তমান বিশ্বের চলমান সংঘাত সংঘর্ষে আরো বেশি অকাট্য হিসাবে প্রমাণিত।
মিথ্যা অজুহাতে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত ইরাকে ধ্বংস যজ্ঞ, লিবিয়ায় কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যার মাধ্যমে সেদেশে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি, সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করে সেখানে অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা, আফগানিস্তানে ক্রমাগত বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ধ্বংসলীলা পরিচালনা, দেড় লক্ষের বেশি ইউরোপিয় সৈন্যের দীর্ঘ সময় আফগানিস্তানে অবস্থান, পৃথিবীর দেশে দেশে নানা সংঘাত সংকট তৈরীর মাধ্যমে অস্ত্রের চাহিদা তৈরী করে অস্ত্র বিক্রি এবং অস্ত্রের বিস্তার, গাজায় অমানবিক, অমার্জনীয় গণহত্যা, ন্যাটোর ক্রমাগত আগ্রাসী এবং উস্কানীর মুখে রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণ অভিযান পরিচালনার পটভূমি তৈরী এতে সামরিক বেসামরিক লক্ষ মানুষের মৃত্যু, দুনিয়ার সমস্ত রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রর্দশন করে ভেনেজুয়েলা নামক একটি সার্ব্বভৌম দেশের প্রধানকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে আসা, সর্বশেষ ইরানে আমেরিকা – ইসরাইলের অন্যায় অযৌক্তিক আক্রমণ পরিচালনা। এই আক্রমণের শুরুতেই ১৬৫ স্কুল ছাত্রীর নিহত হওয়া, নির্বিচার বেসামরিক হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা সমূহ ধ্বংসার্থে ব্যাপক বোমাবর্ষণ, এরই প্রতিক্রিয়ায় ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির আমেরিকার সামরিক স্থাপনা সমূহে আক্রমণ পরিচালনা এবং এক পর্যায়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া।
হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে পৃথিবীর মোট জ্বালানীর প্রায় ২৫% পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধ হওয়ার ফলশ্রুতিতে বিশ্বের বাজারে জ্বালানী তেলের দাম বাড়তে থাকে একই সাথে কোন কোন দেশে জ্বালানী সংকটও দেখা দেয়। এমতাবস্থায় জ্বালানীর অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, মিল কারখানার উৎপাদনে ধস নামে। কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপাদান সার উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনে ঋণাত্বক প্রভাব পড়ে। এমন অবস্থায় শিল্প উৎপাদন যেমন ব্যাহত হয় তেমনি কৃষি উৎপাদনও সংকটের মুখামুখি দাঁড়ায়। আফ্রিকা এশিয়ার অনেক স্বল্প উন্নত দেশ সংকটের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়।
সংকট আরো ঘনীভূত হয় যখন ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার তাবেদার দেশগুলিতে বিদ্যমান সামরিক স্থাপনা সমূহকে তার কার্যকরী নিশানায় পরিণত করে।
ইরান যুদ্ধে আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে যখন সে দেশের সিনেটে ট্্রাম প্রশাসন ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ব্যয় মিটাতে আরো প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে। সিনেটের শুনানীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী রোবিও, যুদ্ধ মন্ত্রী পি হ্যাগসেট সিনেটরদের এক এক প্রশ্নের মুখে বেকায়দায় পড়ে তখন ট্রাম্প প্রশাসনের টনক নড়ে।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে দেখা যায় আমেরিকার ৬০% এরও বেশি মানুষ যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের টনক নড়ে। এ টনক নড়ার পিছনে আরো বড় কারণ, আসছে নভেম্বরে আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ সবের বাইরেও আমাদের সময়কে মানুষের ইতিহাসে অভিশপ্ত কাল বলার পিছনে আমার মনে যে রেখাপাত করেছে তা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি। ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালীন নাগাসাকি হিরোসিমা’য় আনবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই ওয়াকিফহাল। এই পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার এবং এসবে শান দিতে পারমানবিক অস্ত্রধারী দেশগুলি গত অর্থ বছরে ব্যয় করেছে ১১৯ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এ ব্যয় পূর্ববতী বছর থেকে প্রায় ১৭% বেশি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় আমেরিকার ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার। অথচ এই আমেরিকাই আমাদের মত দেশগুলির উপর অতিরিক্ত ট্যারিফ আরোপ করে অথবা ট্যারিফের ভয় দেখিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্র খাতে চীনের ব্যয় ১৩.৫ বিলিয়ন, যুক্তরাজ্যের ১২.৬ বিলিয়ন, রাশিয়ার ৯.৫ বিলিয়ন, ফ্রান্সের ৭.৭ বিলিয়ন, ভারতের ২.৫ বিলিয়ন, পাকিস্তানের ১.১ বিলিয়ন, ইসরাইলের ১.১ বিলিয়ন এবং উত্তর কোরিয়ার ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার। এটা ভাবতে অবাক লাগে আমাদের মত প্রায় ১৮ কোটি মানুষের ২০২৬ – ২৭ অর্থ বছরের উন্নয়ন বাজেট মাত্র ২৭.৫ বিলিয়ন ডলার। এ বাজেটও আবার কোটি হত দরিদ্র মানুষগুলির তেল ডাল নুনের উপর কর আদায়ের মাধ্যমে সংস্থান হবে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী গত অর্থ বছর অর্থাৎ ২০২৫ – ২৬ সালে পৃথিবীতে সামরিক খাতে ব্যয়িত হয়েছে ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন ডলার, তথা ২৮৮৭ বিলিয়ন ডলার। এবার পাঠক ভাবুন আমরা কোন পৃথিবীতে বসবাস করছি এবং কেমন সময় পার করছি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












