‘জলের গানে ঝরনা নামে’ : কিশোরকবিতায় ভিন্নমাত্রা

আনোয়ারুল হক নূরী | শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ

কিশোরের উচ্ছ্বাস ভরা কল্পনার পঙ্খিরাজ যেখানে বাস্তবতার অভিঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে, সেখানে কবি আজিজ রাহমান কিশোরকবিতায় চিত্রকল্পের নতুন মাত্রা যোগ করেন। মায়াময় শব্দ বুননে তিনি যেন এক আলাদা নান্দনিক জগতে নিমগ্ন থাকেন। তাঁর কবিতায় কিশোর মন নিজের স্বপ্ন, বিস্ময় আর অনুভূতিকে খুব সহজেই বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে।

সংহত, সংযত ও রসসমৃদ্ধ এক কিশোর ভুবন নির্মাণে তিনি পারদর্শী। তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো ভাবের ধারাবাহিকতা, উৎপ্রেক্ষা ও উপমার স্বতঃস্ফূর্ত ও সমৃদ্ধ ব্যবহার এবং চিত্রকল্পের সজীবতা। স্বল্পভাষী এই কবি কিশোরকবিতা নির্মাণে শিল্পের পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে মনের মাধুর্য ছড়িয়ে দেন। তাঁর প্রকাশিত কিশোরকবিতার বইয়ের সংখ্যা পাঁচটি। সংখ্যায় কম হলেও তাঁর কবিতার শিল্পমানের উচ্চতা আমাকে মুগ্ধ করে। এই সীমিত সংখ্যার মধ্যেই তিনি একটি স্বতন্ত্র কাব্যকানন নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তাঁর কাব্যকাননের একটি সুরভিত সংযোজন “জলের গানে ঝরনা নামে” নান্দনিকতার মাপকাঠিতে অনায়াসেই উত্তীর্ণ। বইটিতে মোট ১৮টি কবিতা স্থান পায় এবং প্রতিটি কবিতাই নিজস্ব স্বর ও অনুভূতির জন্য আলাদা করে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এই বইয়ের প্রথম কবিতা “বুনব একটি সবুজ গাছ”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৃদয়স্পর্শী “বলাই” গল্পে প্রকৃতিপ্রেমের যে নিবিড় আবেগ ও মমতা আমরা দেখি, তার অনুরূপ এক সংবেদনশীলতার ছায়া ফুটে ওঠে এই কবিতায়। বলা যায়, এটি সমকালীন কিশোর মনের ভেতর থেকে উঠে আসা এক নতুন প্রকৃতিবোধ। যেমনপরাদে গাঁথা সব সবুজ এলো / মাটি ঘেঁষা সেই সবুজ ঘ্রাণ। মন মেলেছি জল ঢেলেছি জেগে ওঠে সব সবুজ প্রাণ। অমনি দেখি, মিলিয়ে একি / ঝুপ ঝুপা ঝুপ সবুজ নাচ/ সবুজাভ হই, চুমকুড়ি হই / ফুল ফুটে হই নতুন গাছ।

এই কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে কিশোর মনের যে নিবিড় সম্পর্ক, তা অত্যন্ত সহজ অথচ গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে গাছ শুধু একটি উদ্ভিদ নয়; বরং তা কিশোর মনের স্বপ্ন, সৃজন ও বেড়ে ওঠার প্রতীক।

একজন কিশোরের মনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে জন্ম নেয় এবং তা কীভাবে আত্মবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়, তার একটি নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায় ‘একবার শুধু’ কবিতায়। কবি আজিজ রাহমান এখানে কিশোরের অদম্য শক্তি ও সাহসকে কল্পনার বুননে এঁকেছেনপৃথিবী তোমার পা ছুঁয়ে পড়বে,/ হাতের মুঠোয় যা কিছু নড়বে। ভর করলেও দস্যি/ দস্যিরা হবে নস্যি। এক লহমায় বলবে তখন / সব কিছু করে ছাড়বো। একবার শুধু বলে দেখ তবে/ পারবো, পারবো, পারবো।

এই কবিতা শুধু অনুপ্রেরণামূলক নয়; এটি কিশোর মনের অন্তর্গত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন কিশোররা নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এ ধরনের কবিতা তাদের মনের জোর পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া বইটিতে মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ, ফাগুনের লাল পলাশের স্মৃতি এবং বাংলা ভাষার আদিঅন্ত্য ইতিহাসও স্থান পেয়েছে। কিশোরকবিতার প্রাণ হলো উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস ও চিত্রকল্প। এই জটিল প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে কবি তাঁর ‘বৃষ্টিরা খুব বলে’ কবিতায় একটি সৃজনশীল ভাষাপ্রয়োগ করেছেন। সাধারণত ক্লীবলিঙ্গ শব্দে ‘রা’ বিভক্তি যুক্ত হয় না (যেমনটেবিলেরা, পানিরা)। কিন্তু কবির বিশেষ প্রয়োগ নৈপুণ্যে ‘বৃষ্টিরা’ শব্দটি বাঙময় হয়ে এক নতুন অনুভূতি সৃষ্টি করেছে এবং শব্দটিকে সজীব করে তুলেছে। ‘জলের গানে ঝরনা নামে’ শিরোনামের কবিতাটি পাঠকমাত্রই মুগ্ধ করে। এর অসাধারণ শিল্পবুনন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুরেলা।

ঝরনা মাতে রাতের সাথে, জ্যোৎস্নার গান বুনে,/ জলের ধারায় চাঁদ ভেসে যায়, চাঁদপানা ঢেউ গুনে।’ এখানে কবি আজিজ রাহমান অনুপ্রাস, ছন্দ ও উপমার কাজ বেশ সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। একজন পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে কীভাবে চাঁদ ভেসে যায়, চাঁদপানা ঢেউ গুনে এ যেন কিশোরের বিস্ময়ভরা ভুবন।

বাংলা সাহিত্যে নদী নিয়ে বহু কবিতা রচিত হয়েছে। বুদ্ধদেব বসুর ‘নদী’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কর্ণফুলী নদী’ কবিতা এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু আজিজ রাহমানের ‘নদী’ কবিতার বিশেষত্ব হলোনদীপাড়ের এক কিশোরের সংবেদনশীল মনোজগতের সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ। যেখানে নদীর সঙ্গে কিশোর জীবনের এক ধরনের টানাপোড়েনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কিশোর এক অপার বিস্ময়ের নাম। প্রকৃতি তাকে আকর্ষণ করে, তার মনকে প্রসারিত করে। মনোবিজ্ঞানী রুশোর মতে, প্রকৃতি হচ্ছে পবিত্র। শিশুকিশোর সেই পবিত্র শিক্ষা প্রকৃতি থেকে শেখে। কবি আজিজ রাহমানের কিশোর চিরচেনা সেই কিশোর। কবিতাটি পাঠ করলেই মুগ্ধ হতে হয়। কবিতাটির শিরোনাম ‘যে আমাকে’।

এখানে কিশোর আপন ইচ্ছায় প্রকৃতির মধ্যে রূপ, রঙ, সুর, ছন্দ, সৌন্দর্য ও ভালোবাসাকে আবিষ্কার করে। এই আবিষ্কারই তার মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি পদক’ ও ‘অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ সহ অনেকগুলো পুরস্কারে ভূষিত কবি আজিজ রাহমান একজন স্বভাজাত কবি। শব্দের বিন্যাসে আলাদা কাব্যিক ঢং তিনি অনায়াসে প্রয়োগ করতে পারেন। তার কবিতা পাঠক হৃদয় জয় করে নেবে অবলীলায়। দীর্ঘকাল ধরে কিশোরকবিতা রচনায় তাঁর গৌরবময় পথচলা প্রশংসার দাবীদার। তাঁর ‘জলের গানে ঝরনা নামে’ কিশোর কাব্যগ্রন্থের সাথে তাঁর সৃজনশীলতার ঝরনাধারা বইতে থাকুক চিরকাল। লেখক: কবি ও শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের উন্নয়ন: আমরা কি সঠিক পথে এগোচ্ছি?
পরবর্তী নিবন্ধবৃষ্টির পানি সংরক্ষণে শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়