পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকা অন্যতম। শ্রীলংকায় প্রতি বছর গড়ে ২৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু দেশটির কিছু জায়গায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম এবং আবার কিছু জায়গায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। দেশটির উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক এবং পূর্বাঞ্চলের পুরো অংশেই পানির ঘাটতি থাকে। সেজন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশটির উক্ত অঞ্চলে পানির চাহিদা পূরণ করা হয়। বিশেষ করে, শ্রীলংকায় বহু গ্রাম আছে যেখানে পানির অন্য কোন উৎস নেই। সেসব গ্রামের মানুষ বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল।
বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য শ্রীলংকার গ্রামাঞ্চলে নানা উপায় অবলম্বন করা হয়। সংবাদমাাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুরো শ্রীলংকায় প্রায় ৪৫ হাজার ছোট–বড় ট্যাংক আছে যেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হয়। শহর এবং গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন বাড়িতে ছোট এবং মাঝারি আকারের ট্যাংক বসানো হয়েছে যেখানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়। বাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতাল এবং মন্দিরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক–ভাবে গড়ে ওঠা পুকুর এবং বড় আকারের অনেক জলাধার আছে যেখানে বৃষ্টির পানি জমা হয়। এসব পুকুর, কুয়া এবং জলাধার পরিষ্কার রাখা হয় এবং মানুষ এগুলোকে দূষিত করেন না।
শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা বলছে, যদি বছরে ১০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতও হয় এবং আপনার বাড়ির ছাদে যে বৃষ্টি পড়বে সেটি যদি সংরক্ষণ করা হয় তাহলে ১০ হাজার লিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব! আমাদের দেশে ভূ–গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে প্রতিবছর পানির স্তর কয়েক মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিষয়টি এখন বেশি হারে উচ্চারিত হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, একটি শহরে চার থেকে পাঁচ মিনিট বৃষ্টির পর পাওয়া যায় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পানি, যেটা সরাসরি পান করার মতো। প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া এই বৃষ্টির পানি যদি সংরক্ষণ করা যেত, তাহলে লাভ হবে দুটো। প্রথমত, বর্ষার সময় জলাবদ্ধতা কমে যাবে এবং দ্বিতীয়ত সেই পানি ব্যবহার করলে ভূ–গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে।
ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলা করতে আমাদের এখন থেকেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি পর্যায়েও এই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উপায় রাখতে হবে।
কিভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার করা যায়? সংবাদ মাধ্যমের একটি প্রতিবেদন পড়ি। সেটি হলো, খুলনার দাকোপের বাজুরা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে বৃষ্টির পানি প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হয়। সেখানে চার বিঘার পুকুরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পর, সেই পুকুর থেকে যন্ত্রের সাহায্যে পানি একটি বড় ট্যাংকে নিয়ে তা পাত্রে ভরে পাঠানো হয় বিভিন্ন এলাকায়। কোনো কোনো এলাকার পানিতে আয়রন থাকায় মাটির বড় পাত্রে রাখা বৃষ্টির পানি রান্না ও পানের জন্য ব্যবহার করা হয়।
সাধারণত পাকা ছাদ বা টিনের চালা পানি সংগ্রহের প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বৃষ্টির প্রথম দিকের পানি ধুলোবালি ও ময়লাযুক্ত থাকে। তাই প্রথম কয়েক মিনিটের পানি ফেলে দেওয়া উচিত (First-Flush)। এরপর পাইপের মুখে তারের জালি বা ফিল্টার ব্যবহার করে ময়লা ছেঁকে নিতে হয়।
বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও শোধন এর আরো কিছু পদ্ধতি আমরা জেনে নিই–
১। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া (রেইন ওয়াটার কালেকশন সিস্টেম) স্থাপন করে প্রাকৃতিক এ পানি মজুত করতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় মাটির নিচে একটি বড় ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়। বৃষ্টি হলে পানি সরাসরি ট্যাঙ্কে জমা হবে। এর সঙ্গে একটি ফিল্টার ও পাম্প থাকবে, যাতে চাহিদা অনুযায়ী তা বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে পারে। ২। বাড়ির ছাদে পতিত বৃষ্টির পানিকে গড়িয়ে মাটিতে পড়া রোধ করে পিভিসি পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সংরক্ষণাগার/ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। ৩। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার জন্য বড় আকারের পাত্র বা ড্রাম নিন। সেক্ষেত্রে ভালো মানের প্লাস্টিকের বিভিন্ন আকারের ড্রাম কাজে লাগানো যেতে পারে। ড্রামের মুখ নেট ও ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন, যাতে মশা, কীটপতঙ্গ বা পোষা প্রাণী দ্বারা পানি নষ্ট না হয়। ৪। বাড়ির ছাদ যদি হয় টিনের, তাহলে তা বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করার জন্য আদর্শ। একটু খাটুনি করে টিনের চালের সঙ্গে ইউ শেপ করে টিন কেটে বসিয়ে দিন। বৃষ্টির সময় ড্রামটি ওই আদল বরাবর বসিয়ে দিন। এতে সহজে পানি ভরে নেয়া যাবে। ৫। স্বল্প পানি সংরক্ষণের জন্য বালতি, বড় জার, বোতল ইত্যাদি ব্যবহার করুন। কিন্তু দ্রুত সময়ের মধ্যে এ পানি ব্যবহার করে ফেলতে হবে। বেশি সময় এ পানি রাখা যাবে না। এতে মশা বংশবৃদ্ধি করার সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে ভালো হয় দুদিনের মধ্যে পানি ব্যবহার করে ফেললে। ৬। অনেক সময় বৃষ্টির পানি যে সকল চালা/ছাদে সংগ্রহ করা হয় এবং পরিবাহীর মাধ্যমে সংরক্ষণাগারে জমা হয় সেসব স্থানে পশুপাখির বিষ্ঠা/গাছের লতাপাতা ও অন্যান্য ময়লা আর্বজনা থাকতে পারে। তাই সরঞ্জামাদি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
খাবার ও সম্পদের জন্য মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী, হ্রদ ও জলাভূমির মতো মিঠাপানির আধারগুলো চাপের মুখে পড়েছে। পানির সংকট বিশ্বব্যাপী এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বলা হচ্ছে, আগামীতে যদি বিশ্বযুদ্ধ বাধে, তাহলে তা পানির জন্যই বাধবে। অথচ পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই পানি; যার বেশিরভাগই পানের অনুপযুক্ত লোনা পানি!
পৃথিবীর পানিসম্পদের মধ্যে বৃষ্টির পানি বিশুদ্ধ, নিরাপদ এবং বিপদমুক্ত হিসেবে বিবেচিত। এ পানিতে রাসায়নিক পদার্থ ও লবণ নেই, আছে প্রাণশক্তি। বাংলাদেশে মৌসুমি জলবায়ুর কারণে প্রায় ৫ (পাঁচ) মাসের অধিককাল সারাদেশে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। পরিস্থিতি বলছে, প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহারের কথা বিবেচনা করতে হবে। বৃষ্টি থেকে প্রাপ্ত ও পানিসম্পদকে সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, নির্মিতব্য প্রতিটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে বৃষ্টির পানি দিয়েই চাহিদার ১৫–২০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে নগরে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যাওয়ার উপায় না থাকায় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, তার প্রকোপও কমবে।
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ),
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)












