চট্টগ্রামের উন্নয়ন: আমরা কি সঠিক পথে এগোচ্ছি?

ড. মোহাম্মদ এয়াকুব | শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী নয়; এটি একটি অনন্য ভূপ্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নগরী। কর্ণফুলী নদী, বঙ্গোপসাগরের উপকূল, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, সবুজ প্রান্তর, দিঘি, প্রাচীন চাক্তাই খাল, ঐতিহাসিক চাক্তাই ঘাট, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম এমন একটি শহর, যার সম্ভাবনা শুধু অর্থনীতিতে নয়; পর্যটন, সংস্কৃতি ও টেকসই নগর উন্নয়নেও অসীম।

তবে বাস্তবতা হলো, এই শহর তার সম্ভাবনার তুলনায় পর্যটন ও নগর নান্দনিকতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অনেকের মতে, অপরিকল্পিত ও পরিবেশসংবেদনশীলতা বিবর্জিত নগরায়ণ চট্টগ্রামের স্বকীয়তা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ঢাকার নগর উন্নয়ন মডেল কতটা চট্টগ্রামের জন্য উপযোগী? চট্টগ্রাম ঢাকার মতো সমতল শহর নয়; এটি পাহাড়, খাল, নদী ও উপকূলনির্ভর জটিল ভূপ্রকৃতির নগরী। ফলে এখানে উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, জলপ্রবাহ, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সিডিএ এভিনিউ এলাকায় নির্মিত ফ্লাইওভার এ প্রসঙ্গে একটি আলোচিত উদাহরণ। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে নির্মিত এই অবকাঠামো কিছু ক্ষেত্রে যান চলাচলের গতি বৃদ্ধি করলেও এর নগর নান্দনিকতা ও উন্মুক্ত দৃশ্যপটের ওপর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যে সড়ক একসময় খোলা আকাশ ও সবুজ পরিবেশের অনুভূতি দিত, সেখানে এখন কংক্রিট নির্ভর অবকাঠামোর আধিপত্য স্পষ্ট। নগর পরিকল্পনায় দৃশ্যমান সৌন্দর্য, পথচারীবান্ধব পরিবেশ, উন্মুক্ত স্থান এবং জনবান্ধব নকশাও যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেটি আমাদের নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ যানজট নিরসনে বিকল্প সমাধানগুলো কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে? গণপরিবহনভিত্তিক পরিকল্পনা, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, খাল ও জলপথ পুনরুদ্ধার, নৌযোগাযোগের উন্নয়ন কিংবা সমন্বিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর হতে পারত কি না, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরনগরী যেমন সিঙ্গাপুর, পেনাং, কোচি কিংবা কলম্বো উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এসব শহরে জলপথ সংরক্ষণ, ঐতিহ্য রক্ষা, পথচারীবান্ধব নগর নকশা, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা এবং পরিবেশসম্মত পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা শুধু অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটনের গন্তব্য হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।

চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতা, যানজট এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি দূর হয়নি। চাক্তাই খাল পুনঃখনন, বাকলিয়া খাল উন্নয়ন, স্লুইস গেট নির্মাণ কিংবা বিভিন্ন সড়ক ও ফ্লাইওভার প্রকল্পের পরও নাগরিক ভোগান্তি অনেক ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে। এসব বাস্তবতা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চাক্তাই খালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। একসময় এই খাল ছিল চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। চাক্তাই ঘাট ছিল নগর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে খালটির ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের অনেক শহর তাদের খাল ও জলপথকে নগর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করেছে। ইতালির ভেনিসে খালভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামেও খালগুলো শুধু পরিবহন নয়, নগর ঐতিহ্য ও পর্যটন অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি এশিয়ার অনেক শহরেও জলপথকে কেন্দ্র করে নগর সংস্কৃতি ও পর্যটনের বিকাশ ঘটেছে। একটি নদী, সমুদ্র, পাহাড় ও খালবেষ্টিত শহর হিসেবে চট্টগ্রামেরও জলপথভিত্তিক পর্যটন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনা আজও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

এখন সময় এসেছে উন্নয়নকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার। উন্নয়ন শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন মানে একটি শহরকে নিরাপদ, বাসযোগ্য, সুন্দর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই করে গড়ে তোলা।

প্রতিটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষাকে বাধ্যতামূলকভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব সমীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত। নাগরিকদের জানার অধিকার নিশ্চিত হলে উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি আস্থা ও জবাবদিহিতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন, পরিবেশ ও ঐতিহ্যের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কারণ এই শহর শুধু বর্তমান প্রজন্মের নয়; এটি আগামী প্রজন্মেরও সম্পদ। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম কেমন হবে শুধু কংক্রিটনির্ভর একটি নগরী, নাকি প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি টেকসই, প্রাণবন্ত ও বিশ্বমানের শহর।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাইরেসির দাপট ও সিনেমার দর্শক
পরবর্তী নিবন্ধ‘জলের গানে ঝরনা নামে’ : কিশোরকবিতায় ভিন্নমাত্রা