পাইরেসির দাপট ও সিনেমার দর্শক

সুপ্রতিম বড়ুয় | শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ

নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকেই মূলত সিনেমা হলবিমুখ হয়ে পড়েছে দর্শক। প্রথমে অশ্লীলতা, নকল এর সমাধান হলেও দর্শক আর সিনেমা হলে ফিরছে না। এ কারণে দেশের প্রায় সহস্রাধিক সিনেমা হল থেকে এখন মাত্র সত্তরের ঘরে এসে ঠেকেছে। প্রযুক্তিগত, নির্মাণগত, প্রতিভাগত ও ঐক্যের সংকট শিল্পটির অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন স্বল্প খরচে নেটে দেশবিদেশি ছবি দেখা যায়। সবার হাতে হাতে রয়েছে মোবাইল। তাই সহজেই সিনেমা দেখার ব্যবস্থা এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এতে প্রকারান্তরে সিনেমা হলে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। তাছাড়া মানসম্মত ছবি নির্মাণ ও সিনেমা হলের সুন্দর পরিবেশ দুঃখজনক হারে কমেছে। তাতে দর্শক সিনেমা হলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়েছেন।

চলচ্চিত্র একটি যৌগিক শিল্প। এর পরিবেশও যৌগিক হতে হবে। অব্যবস্থাপনা ও অনৈক্য এই শিল্পের অধঃপতন ডেকে আনছে। একসময় এই শিল্পে মধ্যস্বত্বভোগী বলে কোনো পক্ষ ছিল না। হঠাৎ করে এই পক্ষের উদ্ভবের কারণে প্রযোজককে প্রতি মুহূর্তে তাদের হাতে নাকাল হতে হচ্ছে। এমনিতেই চলচ্চিত্রের ব্যবসা মন্দ। এর ওপর যদি এই পক্ষ অযৌক্তিকভাবে প্রযোজকের কাছ থেকে বিশাল একটি টাকার অঙ্ক হাতিয়ে নেয় তাহলে প্রযোজককে তো পথে বসতেই হবে। নিয়ম হচ্ছে পণ্য উৎপাদনকারী সরাসরি তার পণ্য বাজারজাত করবে। এখানে তৃতীয় পক্ষের কী দরকার। চলচ্চিত্রের সব পক্ষ মিলে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। ঢাকা শহরেই যথেষ্টসংখ্যক সিনেমা হল নেই। দর্শক কোথায় যাবেন। সিনেমা হলের ব্যবসা এখন অলাভজনক হয়ে পড়েছে। দেখার উপযোগী ছবি হচ্ছে না। আগে বক্তব্যধর্মী ছবি নির্মাণ হতো। সুস্থ ধারার ছবিও তেমন তৈরি হচ্ছে না। ফলে দর্শকদের ওপর সিনেমা হলে না যাওয়ার দায় চাপানো যাবে না। যানজট ঠেলে সময় আর অর্থ নষ্ট করে কেন সিনেমা হলে ছবি দেখতে যাবে। আগে ছবি দেখার জন্য সিনেমা হল ছিল একমাত্র স্থান। এখন মোবাইল ফোন, নেট, স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ নানা মাধ্যমে নানা ছবি দেখা যায়। এতে বড় পর্দায় ছবি দেখার মজা না পেলেও মিনি ফরম্যাটে দেখে পরিতৃপ্ত হচ্ছেন। মানে প্রযুক্তিগত কারণে, যন্ত্রপাতি, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষ এখন এসব মাধ্যমের কারণে একটি ঘোরের মধ্যে আছে। এই ঘোর কাটাতে সিনেমা হলের সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। মাল্টিপ্লেক্সে ৪৫টি স্ক্রিন থাকছে তাতে ৪৫টি ভিন্ন মুভি চলছে। এতে দর্শক তার রুচিমতো ছবি বেছে নিতে পারছেন। এখানেও মাল্টিপ্লেক্স বাড়ানো দরকার। সিনেপ্লেক্স নির্মাণের জন্য সরকার যদি ঋণ দেয় বা প্রাইভেট খাতেও সিনেপ্লেক্স নির্মাণ বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে বিনোদনের জন্য এটি হবে একটি রেভ্যুলেশন। দীর্ঘদিন ধরে সিনেমা হলের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। একই সঙ্গে ভালো ছবি, গল্প আর নির্মাতার অভাব তো রয়েছেই। এখন ছবি দেখার নানা মাধ্যম রয়েছে। তাতে বিশ্বের সব ছবি দেখতে পারছেন মানুষ। তাই অপশন যখন বেশি তখন প্রতিযোগিতা বাড়ানো দরকার। শিল্পীদের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুরনোদের নিয়ে এখনো আমরা আটকে আছি। নতুনদের স্বাগত জানানো দরকার। চলচ্চিত্র অঙ্গনে দলাদলি, রাজনীতি মোটেও কাম্য নয়। এতে সৃজনশীল এই শিল্পের ক্ষতি হয়। চলচ্চিত্র হচ্ছে একটি টিম ওয়ার্ক। যৌথ প্রযোজনার নামে যৌথ প্রতারণাও অনাকাঙ্ক্ষিত। সিনেমা হলে শুধু এফডিসিভিত্তিক ছবি চালালে হবে না। সব দেশের মানসম্মত ছবি প্রদর্শন করা উচিত। উপমহাদেশীয় ছবিকে গত ৫০ বছর ধরে প্রোটেকশন দিয়ে কি আমাদের শিল্পের কোনো উন্নতি হয়েছে? সেন্সর বোর্ডের পরিবর্তে নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে দেশবিদেশের ছবি বাছাই করে প্রদর্শন করতে হবে। বিদেশি ছবি বাংলায় সাবটাইটেল করে প্রদর্শন করলে যারা ইংরেজি বোঝে না তাদের সুবিধা হবে এবং কর্মসংস্থানও হবে। দর্শক ফেরাতে গল্প, চিত্রনাট্য, শিল্পী, নির্মাতা এবং ক্যামেরায় চোখ রাখার অভাব দূর করতে হবে। এখন কিন্তু আলাদা করে নিউজ পেপার, টিভি, সিনেমা, নেট দেখেন মানুষ। সবার হাতে হাতে মোবাইল চলে এসেছে। তাই সিনেমা হলে না গিয়ে প্রায় সবাই এখন মোবাইলে ছবি দেখেন। অন্যদিকে বেশির ভাগ সিনেমা হলের পরিবেশও দর্শক উপযোগী নয়। দর্শক তাই মোবাইলেই বিশ্বের সব ছবি দেখছেন। দেখার মাধ্যম পরিবর্তনের কারণে সিনেমা হল দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছে।

সিনেমা হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ও সৃজনশীল মাধ্যম। সিনেমা বড় পর্দায় দেখার বিষয় বলে বড় পর্দায় দেখার সুষ্ঠু অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সিনেমা হল ভেঙে কেন শপিং মল নির্মাণ হবে। চলচ্চিত্র শিল্পকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে উৎসাহিত করার জন্য সরকার ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের উদ্যোগ নিতে হবে। সিনেমা হলের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্সও বাড়াতে হবে এবং ভালো ছবি নির্মাণ করতে হবে। লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঘরজামাই নিয়ে কিছু কথা
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের উন্নয়ন: আমরা কি সঠিক পথে এগোচ্ছি?