চলে গেলেন কবি আল মুজাহিদী

| শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার দুপুরে কবির মৃত্যু হয় বলে তার ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী জানান। তিনি বলেন, বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল গত বুধবার। এর মধ্যে দুইবার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তার ব্লাড ইনফেকশন ছিল এবং কিডনি ফেইলিউর, হার্ট ফেইলিউর সবই, অ্যাট এ টাইম সব। আজকে বেলা ১টার দিকে আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তারপর তাকে শক থেরাপি দেওয়া হয়, কিন্তু ফাইনালি আর বাঁচানো যায়নি। দেড়টার দিকে বাবা মারা যান। এদিকে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শোক প্রকাশ করেছেন। খবর বিডিনিউজের। আল মুজাহিদী ছিলেন একাধারে কবি, গবেষক ও সম্পাদক। গত শতকের ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি বিবেচিত। ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নারুচি গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন একজন নাট্যকার ও সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন। মা সাখিনা খান ছিলেন গীতরচয়িতা এবং সমাজকর্মী।

১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন আল মুজাহিদী। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি দুইবার স্নাতকোত্তর করেন। বাবার নাট্যচর্চা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার রাজনৈতিক দর্শন আল মুজাহিদীকে প্রভাবিত করেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাঁকেও বেশ কয়েকবার কারাগারে যেতে হয়। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

নিজের কাব্যশৈলীতে তিনি ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তার কাব্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সমাজবিজ্ঞানে ভালো দখল থাকায় নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় নিজের কাব্যছন্দে আত্মীকরণ করে নেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন আল মুজাহিদী। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, দূত পারাবত, মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা, সমুদ্র মেখলা, কালের বন্দিশে, কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি, যুদ্ধ নাস্তি, ঈভের হ্যামলেট, সহস্র দিবস সহস্র রজনী, ‎প্রাচ্য পৃথিবী, পৃথিবীর ধুলো, সৌর জোনাকি, ‎ভিতা নুওভা, অ্যাকাডেমাসের বাগান, সন্ধ্যার বৃষ্টি তাঁর অন্যতম কাব্যগ্রন্থ।

তাঁর লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মানব বসতি, সনেট, আর্কিওপটেরিঙ, স্যোনাটা ও সিলুএট এবং কালমিতি। ‎প্রপঞ্চের পাখি, ‎বাতাবরণ ও ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ তাঁর গল্পগ্রন্থ। রাজ করোটি ও মেরুমৈত্রী তাঁর প্রবন্ধ সংকলন। কাইফি আজমির কবিতা, ‎পৃথিবীর কবিতা, ‎আহমদ ফরাজের কবিতা, উর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা ও ‎হাইনরীশ হাইনের কবিতা তার ‎অনুবাদগ্রন্থ। শিশুকিশোরদের জন্য লিখে গেছেন উপন্যাস লালবাড়ির হরিণ, টুপুনের ডায়েরি; কবিতাগ্রন্থ ইস্টিশানে হুইসেল, সোনার মাটি রূপোর মাটি, পালকি চলে দুলকি তালে; ছড়ার বই হালুম হুলুম ও তালপাতার সেপাই।

পেশাজীবনে তিন দশকের বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আল মুজাহিদী। ২০১২ সালে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন যায়যায় দিন পত্রিকায়। সবশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষান্মাষিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, ‎কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, ‘মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার ও ‎জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফুটবল খেলা নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের মারামারি
পরবর্তী নিবন্ধদুই ইউনিয়নের নাম বদলের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর