পাঁচ বছর বয়সী শিশু জায়হান আবরারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পটিয়াবাসী স্তব্ধ। নার্স ও ফুটবলার পরিচয়ের আড়ালে সাদিয়া সুলতানা নিহা কীভাবে একজন ভয়ঙ্কর খুনি হয়ে উঠেন তা এখন মানুষের মুখে মুখে।
ছোটবেলা থেকে খেলতেন ফুটবল। একজন প্রমিলা ফুটবলার হিসেবে পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অন্যদের সাথে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতেন। পটিয়া ছাড়িয়ে ফুটবলার পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঞ্চলেও। এ সুবাদে পটিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় প্রমিলা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিতেন। পরে ফুটবল খেলার পাশাপাশি পটিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স পেশায়ও নিজেকে যুক্ত করেন। এ দুই পেশার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন পড়ালেখাও। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ড সব হিসাব–নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। খেলার ছলে জায়হানকে বাড়ির সামনের রাস্তার উপর থেকে তুলে নেওয়া, নিজ ঘরে নিয়ে আধা ঘণ্টা–চল্লিশ মিনিটের ভিতর হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা, মুক্তিপণ চেয়ে নিজ হাতে মুক্তিপণের চিঠি লেখা এবং সেই চিঠি গোপনে শিশু জায়হানের ঘরে রেখে আসাসহ পুরো ঘটনায় নিজে শতভাগ জড়িত থাকার কথা উঠে আসে নিহার স্বীকারোক্তিতেই।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, পড়াশোনা, চাকরি বা ফুটবলার পরিচয়ের আড়ালে তার মারাত্মক চুরির অভ্যাস, মাদক সেবন, চঞ্চলতা এবং সাইকো প্রকৃতির আচরণসহ নানাভাবে নিহা নিজ এলাকা এবং কর্মস্থলে পরিচিতি পায়। যার কারণে পটিয়া প্রমিলা ফুটবল টিম, বেসরকারি হাসপাতালে নার্সিং স্টাফ থেকে সাসপেন্ড হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। গত দুইদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিহার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সে ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে কোনো একটি ঘরে আটকিয়ে কয়েকজন নারী পাচারকারী হিসেবে জেরা করছিল। তবে প্রায় দেড় মিনিটের ভিডিও কোথায়, কখন কিংবা কি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি।
পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির পরিচালক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম জানান, সাদিয়া সুলতানা নিহা ছিল অনেকটা সাইকো প্রকৃতির। সে অনেক সময় নিজে নিজে কথা বলতো, হাসতো। তার ছিল মারাত্মক চুরির অভ্যাসও। যার ফলে পটিয়া মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস সেশনে অন্যের ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন চুরি, হাসপাতালে টাকা চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে তাকে ফুটবল টিম থেকে বাদ দেয়া হয় এবং হাসপাতালে নার্স স্টাফ থেকেও বরখাস্ত করা হয়। তার স্বভাব–চরিত্র ছিল অনেকটা সন্দেহজনক।
নিহার প্রতিবেশীরা জানান, সাদিয়া সুলতানা নিহা ছিল উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির। সে স্থানীয় দোকানে বাজার করার ছলে ক্যাশবঙ খুলে টাকা চুরির ঘটনায় একাধিকবার ধরা পড়েছে। সে নিয়মিত মাদক সেবনের সাথে জড়িত ছিল। মাঝেমধ্যে পরিবারকে চট্টগ্রামের বাইরে ফুটবল খেলার কথা বলে ৮/১০ দিনের জন্য বাইরে চলে যেত। তবে কোথায় যেত তা ছিল সবার জানার বাইরে। এলাকাবাসী আরো জানান, নিহা ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। তার কথাবার্তা, ভাব–ভঙ্গিমা ছিল অনেকটা ছেলেদের মত। কথায় কথায় তার মারমুখী আচরণ চোখে পড়ত। তার হাবভাব ও চলনে বলনে ছিল উচ্ছৃঙ্খলতা।
পটিয়া থানা পুলিশ জানায়, একজন মেয়ে হলেও খুনি নিহা অত্যন্ত কঠিন প্রকৃতির। ঘটনার পর তথ্য উদঘাটনে কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও তার কাছ থেকে তথ্য–উপাত্ত বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। শিশু জায়হান হত্যার ঘটনায় এখনো অনেক তথ্য জানার রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
পটিয়ায় সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো জনপদকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মুক্তিপণের লোভে অপহরণ, এরপর হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন একই পরিবারের তিন সদস্য। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো শিশুটিকে খুঁজে বের করার নামে অভিযুক্তরাই পরিবারের সঙ্গে দিন–রাত খোঁজাখুঁজির অভিনয় করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক জানান, বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শিশুর পিতা মো. শাহজাহান বাদী হয়ে পটিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাদিয়া সুলতানা নিহা, তার বাবা সাইফুদ্দিন ও মা শাহানুর আক্তারকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২–৩ জনকে আসামি করা হয়। আদালতের মাধ্যমে তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে।











