দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতি, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া চলমান। এটা বাংলাদেশ পুলিশের সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে অন্যতম সাফল্য। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছিলেন জাহেদ উর রহমান। এছাড়া ভারতের পুশ ইন নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। খবর বিডিনিউজের।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নথি পাঠাল দুদক : বেনজীর আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো (এনসিবি) বাংলাদেশের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব নথির মধ্যে বেনজীরের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার কাগজপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আদালতের আদেশ ও তদন্ত–সংক্রান্ত নথি রয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেসব পাঠানো হবে। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এনসিবির দুই কর্মকর্তা গত দুই দিন ধরে দুদকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তারা বেনজীরের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর অবস্থা, আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করছেন।
প্রত্যর্পণ আবেদনের জন্য আদালতের আদেশ, এফআইআর, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, প্রযোজ্য আইনের অনুলিপি, তদন্ত–সংক্রান্ত নথি, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্তে প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী নথিগুলোর ইংরেজি ও আরবি অনুবাদও সংযুক্ত করা হয়েছে।
গত রোববার সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেনজীরের গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য দেন। আবুধাবির এনসিবির পাঠানো চিঠির বরাতে সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইউএই ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯ অব ২০০৬–এর ১১ ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে।
দুই মামলায় পরোয়ানা, এক মামলায় রেড নোটিশ : বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে অন্তত দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলায় ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল বেনজিরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
ইন্টারপোলের নোটিশে বলা হয়, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে বেনজীর ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন। তবে দুদকের অনুসন্ধানে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ গোপন এবং জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদক আইন অনুযায়ী মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয় দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজিরের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। সেই মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭–এর ৫(২) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩–এর ১১ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এই মামলায়ও বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
একটি মামলায় বিচার, কয়েকটির তদন্ত চলমান : বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসার পর দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি দুদকে হাজির হননি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীর, তার স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজিরের বিরুদ্ধেও পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার অর্থ পাচারের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে বেনজীর আহমদই প্রথম কর্মকর্তা, যিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান তিনি।












