আনোয়ারা উপজেলার চেনামতি বড়ুয়া পাড়ায় মা–মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি রিমন বড়ুয়া ওরফে তেজু বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও ভিকটিমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, টেক্সি কেনার জন্য নেওয়া ঋণের টাকা পরিশোধ এড়াতে এবং ঋণের দলিল (স্ট্যাম্প) হাতিয়ে নিতে চাচাতো ভাবি ও ভাতিজিকে হত্যা করে প্রধান আসামি রিমন বড়ুয়া ওরফে তেজু বড়ুয়া। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এসব তথ্য জানান। গত ১৩ জুন রাত ১১টার দিকে আনোয়ারার উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন– এনি বড়ুয়া (৪০) এবং ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। ঘটনার সময় ঘরে থাকা পাঁচ বছরের শিশু আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যায়।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, গত ১৩ জুন রাতে ট্রিপল নাইন থেকে খবর পেয়ে আনোয়ারা থানা পুলিশ পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি গ্রামের ঘটনাস্থলে (সুজন বড়ুয়ার ঘরে) গিয়ে ঘরের বারান্দা ও কক্ষ থেকে মা–মেয়ের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে। ঘটনার পর জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও আনোয়ারা থানা পুলিশের সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ টিম তদন্ত শুরু করে। ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে রাতদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তদন্তকালে জানা যায়, ঘটনার পর আসামি দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। তাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানা এলাকাসহ সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারসহ স্থানীয়দের দেওয়া সূত্রের ভিত্তিতে গত রোববার রাতে পটিয়া এলাকা থেকে রিমন বড়ুয়া প্রকাশ তেজু বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নিহত এনি বড়ুয়ার চাচাতো দেবর। পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিমন হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
তিনি বলেন, টেঙি কেনার জন্য নিহতের স্বামী সুজন বড়ুয়ার কাছ থেকে এক লাখ ১৭ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল রিমন। এ টাকা সুদসহ কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়ে একটি লিখিত স্ট্যাম্প ছিল। কিন্তু নিয়মিত টাকা পরিশোধ না করায় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ওই স্ট্যাম্প উদ্ধার করে ঋণের দায় থেকে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে রিমন ঘটনার দিন রাতে এনি বড়ুয়ার বাড়ির পেছনে ওৎ পেতে ছিল। একপর্যায়ে এনি বড়ুয়া ঘরের পেছনের দরজা খুলে বাইরে এলে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে। তার চিৎকার শুনে মেয়ে প্রিয়ন্তী এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে একটি মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত। পালানোর সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাড়ির পেছনের খালে ফেলে দেয়।
ঘটনার পর প্রতিবেশীরা যখন ওই বাড়িতে যায়, তখনো এনি বড়ুয়া বেঁচে ছিলেন জানিয়ে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সেখানে একজন একটি ভিডিও ধারণ করেন। তাতে অস্পষ্টভাবে এনি বড়ুয়া একটা নাম বলেছিলেন। আঞ্চলিক উচ্চারণে বলা সেই নাম আমরা বুঝতে না পারলেও প্রতিবেশীরা সেই নামটি বুঝতে পারে। তখন আমরা খোঁজ নিয়ে দেখি, ওই লোক পলাতক। পরে আমরা তাকে খুঁজতে শুরু করি।
ঘটনার পর থেকে তেজু একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করেছিল জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, চন্দনাইশসহ কয়েকটি জায়গায় সে ঘুরতে থাকে। পরে পটিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। তাকে যাতে ট্রেস করতে না পারি, সেজন্য পটিয়ায় রেললাইনের পাশে এনি বড়ুয়ার মোবাইলটি ফেলে দেয়।
তেজু বড়ুয়া স্থানীয়ভাবে খারাপ প্রকৃতির লোক বলে পরিচিত। সে ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিল। তবে এই ঘটনা একেবারে টাকা লেনদেনের ঘটনার জেরে ঘটে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমরা পাইনি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে এসপি মাসুদ আলম বলেন, সুজন বড়ুয়ার কাছ থেকে নেওয়া টাকা সুদে–আসলে মাসে মাসে ফেরত দেওয়ার কথা। এই টাকাটা না দেওয়ার জন্য এই ঘটনা ঘটায়। তেজু বলেছে, ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য ছিল; খুন করার উদ্দেশ্য ছিল না। এনি তাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করায় সে ছুরি মারে।
সুজন বড়ুয়ার পাঁচ বছর বয়সি ছোট সন্তানটি ঘটনার সময় যখন সেখানে যায়। তখন ধস্তাধস্তিতে আঘাত পায় বলে জানিয়েছে তেজু। ওই শিশুকে সে আঘাত করেনি বলে দাবি করেছে।
স্ত্রী ও মেয়েকে খুনের ঘটনায় সুজন বড়ুয়া বাদী হয়ে গত রোববার রাতে আনোয়ারা থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় তেজপ্রিয়কে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল সোমবার আদালতে হাজির করার কথা জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার আরও জানান, গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খাল থেকে ছুরি এবং পটিয়ার একটি পুকুর থেকে নিহতের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তদন্তে এ পর্যন্ত অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া যায়নি। ধার–দেনা ও পারিবারিক বিরোধই এ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এ ঘটনায় আনোয়ারা থানায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার আবেদন করা হবে।











