এনসিটি পরিচালনায় তিন কোম্পানির একটি কনসোর্টিয়ামের আগ্রহ

আছে সাইফ পাওয়ারটেক, বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান সরকারি দলের দুই এমপির । চায় ১৫ বছরের পরিচালন দায়িত্ব । টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বন্দরের, তারা পরিচালনাসহ অন্যান্য দায়িত্বে থাকবে

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ৯ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

দেশের সবচেয়ে বড়, ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় নতুন করে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের বেসরকারি খাতের তিনটি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের পর এবার টার্মিনালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এই কনসোর্টিয়ামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি সরকারি দলের দুজন সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন।

সূত্রে জানা যায়, এনসিটি পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালটি ইজারা নিয়ে পরিচালনার প্রস্তাব দেয়। আওয়ামী লীগের সময়কালের ওই প্রস্তাব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে দরকষাকষি পর্যায়ে পৌঁছালেও বিতর্ক, শ্রমিক অসন্তোষ ও আপত্তির মুখে তা স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি আবারও মূল্যায়ন ও আলোচনা প্রক্রিয়া সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বন্দরের শ্রমিককর্মচারীরা আবারও আন্দোলনের হুমকি দিয়ে রেখেছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের পর মাস কয়েক আগে এনসিটি পরিচালনার আগ্রহ দেখায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ। এর মধ্যে নতুন করে প্রস্তাব দিয়েছে সাইফকসমসএভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম। গত ২৮ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব জমা দেয়। প্রস্তাবে এই কনসোর্টিয়াম ১৫ বছরের জন্য এনসিটির পরিচালন দায়িত্ব নিতে চেয়েছে। জোটের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড, কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কন্টেনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া মোট কন্টেনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালেই হয়েছে। ফলে টার্মিনালটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত দেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

নতুন কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবে টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই রাখার কথা বলা হয়েছে। তারা কেবল পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যয়ের দায়িত্ব নিতে চায়। জাহাজ ও কন্টেনার সংশ্লিষ্ট সব ধরনের মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিনিময়ে প্রতি কন্টেনার পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি পাবে কনসোর্টিয়াম।

নতুন এই কনসোর্টিয়ামের একটি সূত্র জানায়, তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বন্দরের রাজস্ব আয় অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ বেসরকারি খাত বহন করবে। এতে বন্দরের আর্থিক চাপ কমবে এবং অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।

কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বে থাকা সাইফ পাওয়ারটেক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের কন্টেনার অপারেশন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। প্রতিষ্ঠানটি একসময় এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বেও ছিল। বর্তমানে সিসিটিতে তারাই কন্টেনার হ্যান্ডলিংসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। অপর দুই অংশীদার কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসও কয়েক দশক ধরে বন্দরে পণ্য ও কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

জোটের দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে বর্তমান সংসদের দুই সদস্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিমও সরকারি দলের সংসদ সদস্য।

কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চাওয়া প্রস্তাবে প্রতিটি ২০ ফুটি কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে ৬৯ ডলার পরিচালন মাশুল চাওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তথ্য উদ্ধৃত করে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি ২০ ফুটি একটি কন্টেনারের জন্য বন্দর ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার আয় করে। টার্মিনাল পরিচালন খাতে ব্যয় করে ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার। বন্দর নিট মুনাফা করে ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার। তারা প্রস্তাবে বলেছে, কোনো অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই বন্দর প্রতিটি ২০ ফুটি কন্টেনারে ৯২ ডলার মুনাফা করতে পারবে। এছাড়া জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খাতেও কোনো ব্যয় করতে হবে না।

বন্দর ব্যবহারকারীদের একটি সূত্র জানিয়েছে, বন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনার পরিচালনায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে দেশের ভেতরেই অর্থের প্রবাহ বজায় থাকবে এবং জাতীয় সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও নিরাপত্তাগত বিষয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

তবে নতুন এই প্রস্তাব এখনই সিদ্ধান্তের পর্যায়ে যাচ্ছে না। কারণ, এনসিটি পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই বলে সূত্র জানায়।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা সফল না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি অন্যান্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নতুন এই কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবও বিবেচনায় আসতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এনসিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে সরকারের সামনে এখন একাধিক বিকল্প রয়েছে। বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পিপিপি মডেল অথবা পরিচালন সেবাভিত্তিক দেশি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব থেকে যে মডেলই চূড়ান্ত হোক না কেন, তা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের দক্ষতা, সক্ষমতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসএসসির ফল ২০ জুলাই
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬