বিশ্বে প্রতি আধা সেকেন্ডে একটি শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইনে আসে। আন্তর্জাতিক জরিপের এই তথ্য মতে, এতে একদিকে শিশুর জন্য উন্মুক্ত হয় সারা বিশ্বের সব তথ্য। অন্যদিকে এমন সব বিষয় সামনে আসে, যা শিশুর জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।
একটি সাদামাটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খবর পড়েছি সমপ্রতি। যেসব অভিভাবক ছোট শিশুদের হাতে সেলফোন তুলে দেন তাদের জন্য এটি সতর্কবার্তা। খবরটি ছিল–সেলফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ একটি গবেষণা মেটা বন্ধ করে দিয়েছে। মটলি রাইস নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল ডিস্ট্রিক্টের পক্ষে মেটা, গুগল, টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার বিষয়বস্তু ছিল–শিশুদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ লুকানো। মামলার আরজিতে বলা হয়–সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো সচেতনভাবে তাদের পরিষেবার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কিত তথ্য ব্যবহারকারীদের কাছে লুকিয়েছে। বিশেষ কওে, শিশুদের সুরক্ষার ব্যাপারে। অভিযোগে আরো বলা হয়– ‘১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্লাটফর্ম ব্যবহারে প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সাথে স্কুলছাত্রদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে কোম্পানিগুলো।’
বর্তমান যুগ ইন্টারনেটের যুগ। মানবসভ্যতা বিকাশে বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার হলো ইন্টারনেট, যা বিশ্ববিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থার এক অনন্য মাধ্যম। ইন্টারনেটের কল্যাণে পুরো বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেট ছাড়া এখন এক মুহূর্ত চলা দায়! আর এই যুগে শিশুদের জন্য ইন্টারনেট শুধু জরুরি নয়, মহাজরুরি। এর মাধ্যমে শিশুরা বিশ্বনাগরিক হওয়ার লড়াইয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
তবে ক্ষতিকর দিক এড়িয়ে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। ভার্চ্যুয়াল জগতের অপার সম্ভাবনা থাকলেও এর অন্ধকার দিক রয়েছে। অনলাইনে শিশুর সাইবার বুলিং, অনলাইনে যৌন নিপীড়ন, ভ্রান্তবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়া, প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। মনোবিদেরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারে সন্তানদের চেয়ে দক্ষতায় পিছিয়ে অভিভাবকেরা। সেই সুযোগে সন্তানেরা মা–বাবাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। প্রযুক্তির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা জীবন ‘বিগ ডেটা’ যুগে শিশু–কিশোরীদের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে রাখা হবে বোকামি। এ জন্য অভিভাবকদের ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিরাপদ করতে বাবা–মা কে মূলত দুটি জিনিস নজরদারিতে রাখতে হবে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে যে, শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে কোন ধরণের বিপদে পড়ছে কি না। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তারা কোন আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে কিনা।
জাতিসংঘের শিশু উন্নয়ন সংস্থা ইউনিসেফের ওয়েবসাইট থেকে অভিভাবকদের জন্য থাকল বেশ কিছু পরামর্শ:
–শিশুকে ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ুএর বিষয়ে সাবধান করুন। অনলাইনে মেসেজ, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি দেওয়ামাত্রই সেটা আর ব্যক্তিগত থাকে না। এমনকি ডিলিট করলেও ইন্টারনেটে কোনো না কোনোভাবে সেটার চিহ্ন থেকে যায়। তাই নিজের ক্ষতি হবে, এমন কিছু অনলাইনে আদান–প্রদান করা থেকে তাকে সাবধান করুন।
–শিশুর ব্যবহৃত ডিভাইসটি আপডেট করা আছে কি না, সেটি নিয়মিত খেয়াল রাখুন। ডিভাইসটির প্রাইভেসি সেটিংস ঠিক আছে কি না, নিশ্চিত করুন। কারণ, প্রাইভেসি সেটিংস ঠিক না থাকলে যে কেউ তাদের তথ্য দেখতে পারবে কিংবা দখল নিতে পারবে।
–শিশুর ব্যবহৃত ডিভাইসের ওয়েব ক্যামেরাটি অস্বচ্ছ টেপ দিয়ে ঢেকে দিন। ডিভাইসে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা সেফ সার্চ অপশন চালু করে দিন।
–শিশুর জন্য অনলাইনে শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট ব্যবহারেও সতর্ক থাকুন। যদি কোনো সাইট শিশুর ছবি বা পুরো নাম চায়, তাহলে আগে যাচাই করুন সেটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য।
–অন্যের প্রতি কোনো বৈষম্যমূলক বা অপমানজনক আচরণ না করতে সন্তানকে উৎসাহিত করুন। গুজব ছড়ানো, অপমানজনক গল্প বা ছবি শেয়ার করতে নিষেধ করুন। তাকে বোঝান, যেটা একজনের কাছে মজা মনে হয়, সেটা অন্য কারও জন্য অনেক কষ্টের কারণ হতে পারে।
–শিশু যদি অনলাইনে কিছু দেখে ভয়, অস্বস্তি বা কষ্ট পায়, তাহলে সে যেন আপনাকে জানায়। প্রায় সময় দেখা যায়, আশপাশের পরিচিত ব্যক্তিরাই নামে বা বেনামে আপনার সন্তানকে অনলাইনে হয়রানি করে। তাই এ ব্যাপারে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন।
–অনলাইনে শিশু কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করে এবং তারা কী আদানুপ্রদান করে বা কারা সেটা দেখতে পায়, এসব নিয়ে তার সঙ্গে শুরু থেকেই সহজভাবে কথা বলুন।
–শিশু কখন, কোথায় ও কীভাবে কোন ডিভাইস ব্যবহার করবে, তা নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা করুন। ইন্টারনেট ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। এ ব্যাপারে তাকে দায়িত্বশীল হতে উৎসাহ দিন।
–সন্তানের অনলাইনুদুনিয়া বুঝতে হলে, আপনাকেও অনলাইনে আসতে হবে। সন্তান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে সেখানে তার সঙ্গে যুক্ত হোন। তার সঙ্গে অনলাইনে মজার ভিডিওুরিলস আদানুপ্রদান করার পাশাপাশি তাকে সহানুভূতি ও সদ্ব্যবহার শেখানোর জন্য নানা ভিডিও, ছবি বা লেখা পাঠান।
–অনলাইনে অনেক সময় শিশুরা এমন কিছু দেখে ফেলে, যা তাদের বয়স উপযোগী নয়। তাই বয়সের অনুপযোগী কোনো কিছু দেখা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ দিন। সন্তানের বয়স অনুযায়ী অ্যাপ, গেম বা অনলাইন বিনোদনের মাধ্যম খুঁজে বের করুন। তাকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট চিনতে শেখান। বিশ্বাসযোগ্য সূত্র চিনতে সাহায্য করুন।
–আপনার সন্তান আপনাকে অনুসরণ করে। অনলাইনে আপনার সচেতন ও ইতিবাচক আচরণ আপনার সন্তানকে প্রভাবিত করবে। সে আপনার কাছ থেকেই শিখবে।
–অনলাইনে অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে সন্তানকে উৎসাহ দিন। সন্তান যদি অনলাইনে ক্লাস করে, তাহলে তাকে বলুন, সে ক্লাসে যেন সবাইকে সম্মান দেখায়।
–সন্তানের স্কুলে অনলাইন পাঠদানের নিয়মকানুনগুলো ভালোভাবে জেনে নিন। অনলাইনে শিশুদের নিরাপদ রাখতে যে হেল্পলাইন বা সহায়তা আছে, সেসবের খোঁজ রাখুন। সাইবার বুলিং বা শিশুর জন্য অনুপযুক্ত কনটেন্ট রিপোর্ট করার পদ্ধতিগুলো জেনে রাখুন।
–অনলাইনে শিশু কারও দ্বারা বুলিং বা হয়রানির শিকার হলে, সেটা কখনোই তার দোষ নয়। সন্তান অস্বস্তি অনুভব করলে, চুপচাপ হয়ে গেলে বা বিরক্ত হলে তার পাশে থাকুন। বুলিংয়ের শিকার হলে সে যেন লুকিয়ে না রেখে আপনাকে জানাতে পারে, সে ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত করুন।
–ইন্টারনেটের বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে শিশু যেন ভালোগুলোই গ্রহণ করে এবং খারাপগুলো বর্জন করে, সে ব্যাপারে উৎসাহ দিন।
–অনলাইনে সময় কাটানো যেন শিশুর আসক্তিতে পরিণত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখুন। তাকে বই ও পত্রিকা পড়া, খেলাধুলা, নাচ, গান, চিত্রাঙ্কন, কারাতে, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি শখের জায়গাগুলোয় সময় ব্যয় করতে উৎসাহ দিন।
যেহেতু ইন্টারনেটের শিশু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে সে কারণে তাদের অনলাইন পরিচয় ও তথ্য উপাত্ত নিরাপদ রাখায় আরও ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। একই সাথে শিশুদের শৈশবের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়েও সচেতন থাকতে হবে। ইউনিসেফ শিশু ও তরুণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় আরও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছে।
পৃথিবীতে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন শিশু। অনলাইনের ক্ষতিকারক বিষয়বস্তৃর হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা দায়িত্ব সকলের ওপরই বর্তায়। এক্ষেত্রে সরকার, পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া প্রযুক্তি শিল্পের ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের জন্য ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাপসহ খারাপ কনন্টেন্ট ফিল্টারিংয়ের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। মোটকথা, ডিজিটাল বিশ্বে শিশুদের সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব সরকার, পরিবার, স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসহ আমাদের সবার।
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)












