সাদাত হোসেন মান্টো, তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন ‘যখন মানুষকে তাদের দারিদ্র্য ও দুর্ভোগকে ঐশ্বরিক নিয়তি হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়, তখন তারা অনুগত হয়ে পড়ে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করে দেয়’। মান্টোর এ উচ্চারণের এ বোধের সাথে দ্বিমতের কোনও সুযোগ নাই। মান্টোর অনুভূতিকে ধাতস্থ করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে আমার বহু আগের পড়া বিখ্যাত সুইডিশ অর্থনীতিবিদ Gunnar Myrdal (গুনার মিরডাল) রচিত বিখ্যাত বই Asian Drama: An Inquiry into the Poverty of Nations (এশিয়ান ড্রামা–এ্যান ইনকোয়ারি ইন টু দি পভারটি অব নেশানস)’ এর মূল ভাবার্থ আমাকে আলোড়িত করে এবং এ প্রসঙ্গটি আলোচনার দাবী রাখে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান। গুনার মিরডাল তার বইতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া তথা আমাদের এই অঞ্চলে দারিদ্র্য লেগে থাকার এবং এর থেকে উত্তরণের অনাকাঙ্ক্ষার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিদ্যমান দুর্নীতি, উচ্চশ্রেণির সমাজের উপর চেপে বসা এবং ধর্মের ‘ঐশ্বরিক নিয়তি’র বদ্ধমূল ধারণা উৎসারিত বলে উল্লেখ করেছেন।
আমরা আমাদের অঞ্চল তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিলে দেখি কোটারী স্বার্থান্বেষীরা ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষে মানুষে হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষকে সুকৌশলে বিভক্ত করে নিজেদের ইপ্সিত লক্ষ্য হাসিল করে এসেছে। কোটারী স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা ধর্মের আড়ালে এই ভীভক্তির মাঝে তাদের লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায়ন। ধর্মের সিড়ি বেয়ে একবার ক্ষমতারোহন নিশ্চিত হলে তাতে চেপে বসার জন্য ধর্মকে বর্ম হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়। এরই প্রকাশ্য রূপ ধর্মের নামে মানুষে মানুষে দাঙ্গা, হত্যাকাণ্ডের মহোৎসব। যা আমাদের এই উপ মহাদেশ ৪৭ আর ৭১ এ প্রত্যক্ষ করেছে মর্মান্তিক বীভৎসতায়। অথচ ধর্মের মর্মাত্ব মানুষের মাঝে বিভক্তি নয় মানুষের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন, ধর্মের নামে মানুষকে নিগৃহীত করা নয় বরং মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়ানো।
পবিত্র কোরানের সুরা হুজুরাত ১৩ নং আয়াতের এই বাণী টুকুর মর্মার্থ আমরা আত্মস্থ’ করলে কোন মুসলমানের পক্ষে মানুষের অকল্যাণ কামনা, মানুষকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা তা কতটুকু অন্যায্য তা স্পষ্ট হয়ে ওঠার কথা ‘mankind, indeed We have ceated you from male and female and made you peoples and tribes that you may know one another. Indeed, the most noble of you in the sight of Allah is the most righteous of you’. অর্থাৎ ‘হে মানবজাতি। আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর জোড়া থেকে সৃষ্টি করেছি এবং পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করার জন্য তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি এবং গোত্রে বিন্যস্ত করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই তোমাদের মাঝে যে সবচেয়ে বেশি ন্যায়বান সে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত’।
একজন পুরুষ ও একজন নারীর জোড়া’কে পবিত্র কোরান শরীফের সুবিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদক আল্লামা ইউসুফ আলী তার উপক্রমনিকায় ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে ‘পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একই পিতা মাতার সন্তান। সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে মানব গোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং কালক্রমে পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক প্রভাবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় এবং বিভিন্ন জাতির ও গোত্রের সৃষ্টি হয়। জাতি গোত্র র্নিবিশেষে আল্লাহর কাছে সেই সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে ন্যায়বান এবং সৎকর্মশীল’।
পবিত্র কোরান শরীফ’ এর ৫ নাম্বার সুরা মাইদা’র ৪৮ নাম্বার আয়াতে সৃষ্টির্কতা মানুষের জন্য যে বাণী প্রেরণ করেছেন তা যদি মানুষ আত্মস্থ’ করে এবং অনুসরণ করে তবে মানুষের মাঝে সংঘাত সংঘর্ষ হওয়ার কথা নয়, কেবল ভাল আর মন্দের মাঝে পার্থক্য ছাড়া। সুরা মাইদা’র এই আয়াতে বলা হয়েছে ‘To you We sent the Scripture in truth, confirming the scripture that came before it, and guarding it in safety ; so judge between them by what God has reveled and do not follow their vain desires, diverging from the truth that has come to you. To each among you, We have prescribed a Law and an Open Way. If God has so willed, He would have made you a single people, but (His plan is) to test you in what He has given you; so, strive as in a race in all virtues. The goal of you all is to God: it is He that will show you the truth of the matters in which you dispute’
‘আমি তোমার উপর সত্যসম্বলিত গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থের সত্যতা সমর্থন করে এবং তার নিরাপত্তা সংরক্ষণ করে। কাজেই আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সেই অনুসারে তাদের মধ্যে বিচার নিষ্পন্ন কর এবং তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা থেকে সরে গিয়ে তাদের নিষ্ফল বাসনা অনুসরণ কর না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নীতি ও উন্মুক্ত পন্থা নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তোমাদের এক সম্প্রদায়ভুক্ত করে নিতেন। কিন্ত্তু তার পরিকল্পনা তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করা। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহর কাছে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে। যে সব বিষয়ে তোমরা বিতর্ক কর সেগুলোর মধ্যে সত্যটাকে তিনি তোমাদেরকে প্রদর্শন করবেন’।
এত দীর্ঘ উদ্ধৃতির কারণ এই উদ্ধৃতির মাঝে অনেক বিষয় নিহিত রয়েছে, যেমন আমাদের পূর্ববর্তী ধর্মগুলি সত্য এবং তা সমর্থিত স্্রষ্টার পক্ষ থেকে। এটাও এই আয়াতে স্পষ্ট স্্রষ্টাই তার ইচ্ছায় মানব সম্প্রদায়কে নানা পথে মতে বিভক্ত করেছেন। অর্থাৎ এ বিভক্তির মাঝে পরস্পর হানাহানি, দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত থাকার কথা বলা হয়নি। বরং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সাধনা দ্বারা মানুষ উৎকর্ষ লাভ করতে পারে সে কথাটিই এ আয়াতের মূল নির্যাস। অধিকন্ত্তু মানুষকে সৎ কাজে প্রতিযোগিতার আদেশ দেওয়া হয়েছে কোন অসৎ কাজে নয়।
ধর্মের এই প্রভাব আর প্রভায় মানুষ যে কীভাবে প্রভাবিত হয়েছেন তার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ না করলে নয়। এই ঘটনাটি আমার পূর্বের এক লেখায় আগেও আমি উল্লেখ করেছি। প্রসঙ্গক্রমে পুনরুক্তি করছি। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রঃ) সিরিয়া সফরে গেছেন। সিরিয়ার গভর্নর তখন হজরত আবু উবায়দা (রঃ)। সফরের এক পর্যায়ে খলিফা হজরত উমর (রঃ) হজরত আবু উবায়দা (রঃ)’র সাথে রাতে আহার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এতে হজরত আবু উবায়দা (রঃ) বিনয়ের সাথে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। হজরত উমর (রঃ)’র পিড়াপীড়িতে হজরত আবু উবায়দা (রঃ) বলেন, আমি যে আহার গ্রহণ করি মাননীয় খলিফা তা আপনি গ্রহণ করতে পারবেন না। অবশেষে হজরত উমর (রঃ)’ র একান্ত আগ্রহে হজরত আবু উবায়দা (রঃ) তার সামনে খাবার পরিবেশন করেন। পরিবেশিত খাবারের প্রতি হজরত উমর (রঃ) অবাক হয়ে দেখে থাকেন। একটি বাটিতে লবণ পানি মিশ্রিত একটি ছাতুর রুটি। হজরত উমর (রঃ)’ হজরত আবু উবায়দা (রঃ) কে জিজ্ঞেস করেন ‘আবু উবায়দা তুমি এই খাবার গ্রহণ কর? বায়তুল মাল থেকে যে সম্মানী তুমি পাও তা দিয়ে ত তুমি এর চেয়ে অনেক ভালো খাবার খেতে পার।
হজরত আবু উবায়দা (রঃ) এর উত্তরে জানান ‘এয়া খলিফাতুল মুসলেমিন বিষয়টি টাকা পয়সার বা সামর্থ্যের নয়, বিষয়টি আমার নবী করিম (সঃ) এর জীবিত কালে তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন ‘আবু উবায়দা আমি তোমাকে এই দুনিয়ায় যে ভাবে রেখে যাচ্ছি হাশরের ময়দানেও যেন তেমনি ভাবে পাই’ হজরত উমর (রঃ) এর উদ্দেশ্যে এতটুক বলে হজরত আবু উবায়দা (রঃ) জানান সেদিন আমার নবী (সঃ) এর কাছে ওয়াদা করেছিলাম, আমাকে তিনি যেভাবে দুনিয়ায় রেখে যাচ্ছেন আখেরাতেও সেভাবে পাবেন। এই ওয়াদাকালীন সময়ে আমি এই ছাতুর রুটিই খেতাম, এখন আপনি বলুন আমি কী করে আমার নবী (সঃ) কে দেওয়া ওয়াদা থেকে বিচ্যুত হব? সেই থেকে আজ অব্দি আমি ছাতুর রুটিই খাই এবং বাকী জীবনও তাই করব। ইসলামের দুই মহান ব্যক্তিত্ব সেদিন হয়ত পারলৌকিকতার প্রবাল আলোয় ডুবেছিলেন অনেক্ষণ। এ থেকে সৎ জীবন, ওয়াদা খেলাপ না করার এবং স্বীয় নবী (সঃ) প্রতি দেওয়া ওয়াদার প্রতি অবিচল থাকার এক মহান শিক্ষাই আমরা গ্রহণ করতে পারি।
আফ্রিকার দরিদ্র দেশ মালাউই। জয়েস বান্দা মালাউই’র প্রেসিডেন্ট। ২০১২ সালে হত দরিদ্র, খাদ্যাভাবে অপুষ্টির যাতাকলে পিষ্ট হাজারো শিশুর কথা বিবেচনা করে, ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে জয়েস বান্দা প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত জেট বিমান, ৬০ টি বিলাস বহুল মার্সিডিজ গাড়ি বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঐ সব শিশুদের খাদ্য যোগাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার আদেশ দেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো কাজ, শিশুদের কল্যাণে – মানুষের মঙ্গলার্থে।
মানবজাতি বিশ্ব–ব্যাপী এ শিক্ষায় যদি ঋদ্ধ হত শুদ্ধ হত তবে এই একবিংশ শতাব্দীতে গাজা’র অমানবিকতা সৃষ্টি হত না, ইউক্রেন যুদ্ধের বিভীষিকা, ইরান যুদ্ধের ধ্বংস লীলা মানুষকে অবলোকন করতে হত না। আমাদের এই মহাদেশেও জাতিগত হিংসা বিদ্বেষের চাষ হত না, হলেও মানুষ যদি মানুষের কল্যাণে, মঙ্গলে নিজেকে ব্যাপৃত রাখত তবে সে চাষ বিফলে যেত। পৃথিবীর মানুষ বিশেষ করে আমাদের এ অঞ্চলত বটেই যদি মানুষের প্রতি মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ, মমত্ববোধে উজ্জীবিত হত তবে ধর্মীয় গোঁড়ামির আশ্রয়ে হানাহানি খুনাখুনিতে মানুষ নিমজ্জিত হত না। একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতাদর্পী মানুষের সামনেইত জাতিগত সহিংসতার উলঙ্গ আস্ফালনের চূড়ান্ত রূপ আমাদের দক্ষিণ সীমান্তে রোহিঙ্গা সংকট।
পরিশেষে পবিত্র কোরান শরীফ–এর ৫ নাম্বার সুরা মাইদা’র ৩২ নাম্বার আয়াতের একটি অংশ উদ্ধৃত করে শেষ করছি Whoever killeth a human being for other than manslaughter or corruption in the earth,it shall be as if he had killed all mankind, and whoso had saved the life of one, it shall be as if he saved the whole mankind অর্থাৎ ‘হত্যার বিনিময় বা দেশে অনিষ্ট বিস্তারের কারণ ছাড়া যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে, সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল এবং যদি কেউ একটি মানুষের জীবন রক্ষা করে, সে যেন সমস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করল’।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












