অবশেষে টানা ৩৬ দিনের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে দিল্লির যন্তর মন্তরে গড়ে ওঠা এ নজিরবিহীন আন্দোলন গতকাল শনিবার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার পর প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে। সরকার আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর সন্ধ্যায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন সমাপ্তির ঘোষণা আসে। দীর্ঘদিন অনড় অবস্থানে থাকার পর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আন্দোলনকারীরা নিজেদের বিজয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নতি স্বীকার হিসেবে দেখছেন।
গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রকাশিত এক চিঠিতে তিনি লেখেন, প্রথম দিন থেকেই আমি এ ঘটনার দায় নিয়েছি এবং পরিস্থিতি থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিইনি। চিঠিতে তিনি আরও বলেন, যন্তর মন্তর এবং সারা দেশে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে যেন কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি কাজে লাগাতে না পারে, জাতীয় ঐক্য যেন অটুট থাকে, কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং আমাদের সন্তানেরা যেন পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গঠনে মনোযোগ দিতে পারে–এসব বিষয় বিবেচনা করে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট–এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর সারা ভারতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকে। শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ এই আন্দোলনে সংহতি জানান। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।
আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক অনশন শুরু করেছিলেন। ২৬ দিন অনশনের পর গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি অনশন ভাঙেন। এর আগে ১৮ জুলাই দিল্লি পুলিশ তাকে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করলে আন্দোলনে নতুন গতি আসে।
২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনকারীরা। তবে পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। অভিযানের সময় বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ২০টি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে ১৫টিই দিল্লিতে। আন্দোলন ঘিরে রাজধানী দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। যন্তর মন্তর ঘিরে যান চলাচল অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়, আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভিড় কমে যায় এবং ২৫ জুলাই সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লি মেট্রোর ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলনের মধ্যে সরকার ও সিজেপির মধ্যে তিন দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত শুক্রবার দ্বিতীয় দফার বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। সেখানে সিজেপি তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরেন–ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ। সরকার নীতিগতভাবে দুটি দাবি–আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সম্মতি দিলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে তখন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিজেপি সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় এবং জানিয়ে দেয়, পদত্যাগ না হলে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
তবে গতকাল বিকেলে তৃতীয় দফা বৈঠকের আগেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণা আসে। এরপর সন্ধ্যায় দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে সরকার ও সিজেপির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকারের সম্মতি আন্দোলনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে শুরুতে অনমনীয় অবস্থান নেওয়া মোদী সরকার শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতার পথেই হাঁটল।











