রকেট বিস্ফোরণে পরিবেশকেও গুনতে হয় মাশুল

| মঙ্গলবার , ২ জুন, ২০২৬ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ

মহাকাশ জয়ের নেশায় পৃথিবীতে দিন দিন বাড়ছে রকেটের আকার ও উৎক্ষেপণের সংখ্যা। তবে মহাকাশ অভিযানে রকেট বিস্ফোরণের শিকার হলে পরিবেশকে গুনতে হয় বড় মাশুল। বিবিসি লিখেছে, ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল টেঙাসের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে স্পেসএঙের তৈরি ‘স্টারশিপ’ রকেটটি ধীরে ধীরে আকাশের দিকে ওড়ার সময় অনেকেই অনুমান করেননি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এ রকেটের প্রথম যাত্রাটি কতক্ষণ স্থায়ী হবে।

রকেটটি নিজের ৩৩টি ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে মেঘহীন আকাশ ভেদ করে উঠে যাওয়ার সময় রাস্তার দুপাশে জড়ো হওয়া উৎসুক জনতার মধ্যে করতালির রোল পড়ে গিয়েছিল। তবে এ আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল কেবল ৩ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড। ৯০ মিনিটের পরিকল্পিত যাত্রার শুরুতেই হঠাৎ মহাকাশযানটি বিস্ফোরিত হয়ে এর ধ্বংসাবশেষ বৃষ্টির মতো সাগরে গিয়ে পড়ে। খবর বিডিনিউজের।

এ ঘটনাকে স্পেসএক্সের প্রকৌশলীরা ঘুরিয়েপেঁচিয়ে বলেছিলেন, এমনটা রকেটটির দ্রুত অনির্ধারিত ভাঙন। অন্যদিকে স্পেসএক্সের মালিক ইলন মাস্কের চোখে বিষয়টি ছিল এক উত্তেজনাকর ঘটনা। সব মিলিয়ে মিশনটি এক প্রকার সফল বলেই ঘোষিত হয়েছিল।

প্রকৌশলবিদ্যার জায়গা থেকে দেখলে এমনটা সত্যিই বড় সাফল্য, কারণ স্টারশিপ রকেট প্রযুক্তির চেনা সীমানাকে এক ধাক্কায় অনেক দূর নিয়ে গিয়েছে।

২০২৪ সালের জুনে স্টারশিপ রকেটের সফল উৎক্ষেপণের পর অনেকেই মনে করছেন, মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো বা একদিন মানুষকে পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্টারশিপই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। প্রথম উৎক্ষেপণের সরাসরি সম্প্রচার শেষ হওয়ার পর প্রকৌশলীরা বড় ধাক্কা খেলেন। তারা খুঁজে পেলেন, রকেটের এ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ কেবল রকেটটিকেই ধ্বংস করেনি, বরং মাটির ওপর থাকা আস্ত উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা লঞ্চপ্যাডকেও একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, এর ধ্বংসাবশেষ আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রকেট দুর্ঘটনার ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সস্প্রতি ২০২৬ সালের ২৮ মে সাধারণ এক ইঞ্জিন পরীক্ষার সময় জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের ‘নিউ গ্লেন’ রকেটেরও এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

ঘন ঘন দুর্ঘটনার পর এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, মহাকাশ রকেটের বিভিন্ন উৎক্ষেপণ এমন মারাত্মকভাবে বিস্ফোরিত হলে পরিবেশের ওপর ঠিক কতটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে? যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে, মেঙিকো উপসাগরের ঠিক কোল ঘেঁষে অবস্থিত স্পেসএক্সের বোকা চিকা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য কোম্পানিটি সবসময় পূর্ব দিকে রকেট উৎক্ষেপণ করে। যার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে রকেটের কোনো ধ্বংসাবশেষ ভেঙে পড়লে তা সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ে।

তবে সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর এ রকেট দুর্ঘটনার প্রভাব আসলে কতটা তা এখনও স্পষ্ট না হলেও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এ উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটির আশপাশ জুড়েই রয়েছে বিভিন্ন ন্যাশনাল পার্ক ও জাতীয় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। অঞ্চলটি বিপন্ন উদ্ভিদ ও পরিযায়ী বা অতিথি পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক আশ্রয়স্থল।

২০২৩ সালের এপ্রিলের সেই বিস্ফোরণের সময় পুরো উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি ধুলা আর ধোঁয়ার মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। রকেটের প্রচণ্ড আগুনে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের কংক্রিটের মেঝেতে বড় গর্ত তৈরি হয় এবং সেই ধাক্কায় বালি, মাটি, ধাতুর টুকরা ও কংক্রিটের বড় বড় ছাই বাতাসে উড়ে গিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এ ঘটনায় কোনো মানুষ আহত না হলেও স্থানীয় এক পাবলিক রেডিও প্রতিবেদনে বলেছিল, কাছের জনবসতিগুলোর ওপর আকাশ থেকে ছাই ঝরে পড়েছিল। পরে দেখা যায়, আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল রকেটের বিষাক্ত ধ্বংসাবশেষে ভরে গেছে।

পরিবেশগত এ ক্ষতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্টারশিপের উৎক্ষেপণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল মার্কিন সংস্থা ইউএস ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস। এরপর থেকে উৎক্ষেপণের আগে স্পেসএঙ পরিবেশ রক্ষার বেশ কিছু কঠোর শর্ত মেনে চলতে রাজি হয়। তবে তারা রকেটটিকে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে আটকে রেখে ইঞ্জিন পরীক্ষামূলকভাবে চালুও করলেও ওই সময় ফুল থ্রাস্ট বা পূর্ণ শক্তিতে পরীক্ষা করা হয়নি।

উৎক্ষেপণের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এঙে এক পোস্টে মাস্ক স্বীকার করেছেন, রকেট ওড়ার সময় নিচের প্রচণ্ড উত্তাপ কমানোর জন্য যে বিশাল ওয়াটারকুল্ড স্টিল প্লেট বা পানির মাধ্যমে ঠান্ডা রাখার লোহার পাত বসানোর কথা ছিল তা সময়মতো তৈরি ছিল না। পরবর্তীতে অবশ্য কোম্পানিটি আরও উন্নত প্রযুক্তিতে তাদের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি নতুন করে তৈরি করেছে। তবে এ বিস্ফোরণটি পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের মনে বড় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রতি বছর মহাকাশে পাঠানো স্যাটেলাইট বা বস্তুর সংখ্যা এখন হাজারে গিয়ে ঠেকেছে এবং যেভাবে একের পর এক নতুন রকেট তৈরি হচ্ছে তাতে রকেট প্রযুক্তির এ অনিচ্ছাকৃত ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে অনেকেই চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্কস কনজারভেশন অ্যাসোসিয়েশন বা এনপিসিএর সংরক্ষণ কর্মসূচির উপসহসভাপতি সারাহ গেইনস বারমেয়ার বলেছেন, এসব বিস্ফোরণ চোখে দেখা সত্যিই কষ্টের।

রকেটের ধ্বংসাবশেষ পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষতি করে তা ছাড়া আগুন লাগার ঝুঁকি, বাতাস ও পানি দূষণ তো আছেই। আমরা চাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা এলাকার কাছাকাছি এ ধরনের মহাকাশযান উৎক্ষেপণের আগে নিরাপত্তা ও পরীক্ষানিরীক্ষা আরও জোরদার করা হোক।

বোকা চিকার এ বিস্ফোরণের পর বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন মিলে উৎক্ষেপণের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরুদ্ধে একটি মামলাও ঠুকে দিয়েছিল। বর্তমানে এনপিসিএ জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের উপকূলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছে বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ কেন্দ্র গড়ে তোলার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র সমপ্রসারণের যে পরিকল্পনা চলছে, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।

২০২৬ সালের মে মাসে জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের রকেট বিস্ফোরণে কেপ ক্যানাভেরালে ঠিক কী পরিমাণ দূষণ ছড়িয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি খতিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিস্ফোরণটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটিকে ধ্বংস করার পাশাপাশি আশপাশের বেশ কয়েকটি ভবনেরও ক্ষতি করেছে। কোম্পানি বলছে, রকেটের কিছু বিপজ্জনক ধ্বংসাবশেষ সাগরে গিয়ে পড়েছে এবং তা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ভেসে উপকূলে চলে আসতে পারে।

নাসার মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কেপ ক্যানাভেরালে এখন স্টারশিপ রকেটের জন্য নতুন এক উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরির পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করছে মার্কিন বিমান বাহিনী। স্থানীয় মানুষের মতামত জানতে সম্প্রতি তারা গণশুনানিও করেছে।

তবে নতুন প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হতে পারে। কারণ সেটি করতে গেলে বনাঞ্চলের সীমানার আরও কাছাকাছি একেবারে নতুন এক উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে।

সারাহ বারমেয়ার বলেছেন, এসব অঞ্চল মহাকাশ শিল্পের প্রভাবের সঙ্গে অভ্যস্ত। তবে নতুন প্রস্তাবগুলোতে আমরা যা দেখছি তাতে এগুলো সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এলাকার দিন দিন আরও কাছাকাছি চলে আসছে। আর এখানেই আমাদের মূল আপত্তি। কেপ ক্যানাভেরালের আশপাশ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীতে ঘেরা, যার মধ্যেই রয়েছে মেরিট আইল্যান্ড ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজ, যা বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি।

নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা দলের প্রধান ডন ডানকার্ট বলেছেন, এ সীমানার মধ্যে প্রায় এক হাজার একশ ৩৩ প্রজাতির উদ্ভিদ, একশ ৪১ প্রজাতির মাছ, ৭৪ প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ, তিনশ ১৮ প্রজাতির পাখি এবং ২৯টি ভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে।

এদের মধ্যে ২১টি প্রজাতি সরকারিভাবে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত, যেমন এক ধরনের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী ম্যানাটি, সামুদ্রিক কচ্ছপ ও আমেরিকার জাতীয় প্রতীক বল্ড ঈগল।

সেই আশির দশকে স্পেস শাটল শুরুর দিকের উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের রকেট উৎক্ষেপণের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে নাসা। এক বিবৃতিতে নাসা বলেছে, ৩০ বছর ধরে করা মোট ১৩৫টি উৎক্ষেপণের পর প্রধান পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে দেখা গেছে এসব অঞ্চলে অ্যালুমিনিয়ামের কণার জমা, গাছপালার ক্ষতি ও আশপাশের জলাশয়ের পানির পিএইচ বা অম্লতার পরিমাণ সাময়িকভাবে কমে যাওয়া।

এসব প্রভাবের জন্য স্পেস শাটলের সলিড রকেট বুস্টারে ব্যবহৃত জ্বালানিকে দায়ী করেছে নাসা। সংস্থাটি বলেছে, ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্টেমিস মিশনের উৎক্ষেপণের পরেও একই ধরনের ফলাফল দেখা গিয়েছিল। কারণ সেখানেও একই সলিড রকেট প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সংস্থাটি আশ্বস্ত করেছে, তারা এসব অঞ্চলের নিয়মিত পানি ও বাতাসের মান পরীক্ষা করে এবং বন্যপ্রাণীদের ওপর স্পেস শাটল উৎক্ষেপণের তাৎক্ষণিক ক্ষতিকর প্রভাব ছিল একেবারেই নগণ্য।

ডন ডানকার্ট আরও বলেছেন, নাসার উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত প্রতিটি যানকে উৎক্ষেপণ অনুমতি দেওয়ার আগে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যই থাকে উৎক্ষেপণের পরিবেশগত প্রভাব যেন সর্বনিম্ন রাখা যায় এবং তা বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি না করে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ সচেতন চিত্রটির সঙ্গে রাশিয়ার মহাকাশ কেন্দ্রের তুলনা চলে না। কাজাখস্তানে অবস্থিত বিশ্বের প্রথম মহাকাশ কেন্দ্র বাইকোনুর কসমোড্রোমকে বলা যায় অনিয়ন্ত্রিত মহাকাশ অভিযানের এক চরম সতর্কবার্তা, যার বিস্তীর্ণ সমতল ভূমির এক বড় অংশ পরিত্যক্ত রকেট থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার তৈরিকারী বিষাক্ত জ্বালানিতে দূষিত হয়ে পড়েছে। তবে একদিক থেকে এমন যুক্তিও দেওয়া যায় যে, কেপ ক্যানাভেরালে এই মহাকাশ কেন্দ্রটি থাকার কারণেই হয়ত আশপাশের প্রকৃতি আজও টিকে আছে।

ফ্লোরিডার উপকূলের বেশিরভাগ এলাকাজুড়ে এখন হোটেল, রেস্তোরাঁ আর অ্যাপার্টমেন্টের ভিড়, যা ঠিক যেন জনি মিচেলের সেই বিখ্যাত গানের লাইনের মতো, স্বর্গকে পিটিয়ে পার্কিং লট বানানো হয়েছে। কেবল নিরাপত্তা ও বিস্ফোরণের ঝুঁকির কারণেই এ রকেট উৎক্ষেপণের মূল কেন্দ্রের কাছাকাছি কেউ কোনো বহুতল ভবন তুলতে পারেনি।

অন্যদিকে, ফ্রেঞ্চ গায়ানার কুরু অঞ্চলে ইউরোপীয় স্পেস সংস্থা বা ইএসএ তাদের নতুন বড় আকারের রকেট ‘আরিয়ান৬’এর প্রথম উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিরক্ষরেখার ঠিক উত্তরে অবস্থিত এই ৬৫০ বর্গকিলোমিটারের মহাকাশ কেন্দ্রটি একদিকে ম্যানগ্রোভ জলাভূমি ও অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্টে ঘেরা, যেখানে রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বড় বিড়ালজাতীয় হিংস্র প্রাণী জাগুয়ার, যা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের তালিকায় রয়েছে।

ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির অবকাঠামো প্রধান লুস ফ্যাব্রেগুয়েটস বলেছেন, এ এলাকাটি খুব চমৎকারভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মহাকাশ কেন্দ্রের সীমানার ভেতর কোনো চাষাবাদ হয় না। ফলে এখানে কোনো রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ গোটা এলাকায় শিকার করাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এখানকার বাতাস, মাটি ও পানির মান সবসময় পরীক্ষা করা হয় এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেড়ায় ছোট ছোট ছিদ্র রাখা হয়েছে, যেন ব্যাঙেরা সহজেই যাতায়াত করতে পারে।

তবে কেপ ক্যানাভেরালের মতোই তারাও সলিড রকেটের ধোঁয়া থেকে বাতাসে উচ্চমাত্রার অ্যালুমিনিয়াম ও অম্লতার উপস্থিতি রেকর্ড করেছে। লুস ফ্যাব্রেগুয়েটস অবশ্য বলেছেন, এর প্রভাব খুবই সামান্য ও সাময়িক, যা উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের আশপাশের কেবল ৫০০ মিটার এলাকার মধ্যে সীমিত।

আগামী জুলাইয়ে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি হিসেবে প্রথম ‘আরিয়ান৬’ রকেটের চূড়ান্ত কাজ চলছে। মাস্কের অভিজ্ঞতা যেমন বলে, যে কোনো রকেটের প্রথম উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আসতেই পারে। ১৯৯৬ সালের জুনে প্রথমবারের মতো ‘আরিয়ান৫’ রকেটটি উৎক্ষেপণের সময় সফটওয়্যারের একটি ভুলের কারণে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় তা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ফলে এবার মিশন পরিকল্পনাকারীরা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ছক কষছেন।

প্রথমত, রকেটটি কেবল তখনই উৎক্ষেপিত হবে যখন বাতাসের গতিপথ ধ্বংসাবশেষকে সাগরের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, রকেটটি যদি মাঝ আকাশে ভেঙেও যায় তবে একে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন তা ছোট ছোট টুকরো হয়ে যায়, যাতে মাটিতে আছড়ে পড়ার পর ক্ষয়ক্ষতি কম হয়।

মহাকাশ থেকে নেওয়া আমাদের এ ভঙ্গুর নীলসবুজ পৃথিবীর প্রথম ছবি থেকে শুরু করে বর্তমানের স্যাটেলাইট, যা আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে এই মহাকাশ বিজ্ঞানই পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তবে পরিবেশের ওপর ব্যর্থতার প্রভাব বিবেচনা না করে যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে মহাকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলা বা নতুন রকেট তৈরিতে তাড়াহুড়ো হয় তবে তা প্রকৃতি রক্ষার পুরো প্রচেষ্টাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

এরপরও সারাহ বারমেয়ার ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বলেছেন, আমাদের ধারণা, মহাকাশ বিজ্ঞান ও পরিবেশের মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব। মহাকাশ শিল্প ও প্রকৃতি সংরক্ষণ উভয়ই হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমমতার দলে ‘ভাঙন’, বাড়ছে বিদ্রোহ
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রকৃতি উৎসব ৪ জুন