পাহাড় কাটার অভিযোগ মোকাবেলা করে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয়। ভাড়া ভবন থেকে কোরবানির ঈদের পর এই ভবনে বিপিসির প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর কথা। নগরীর সার্সন রোড সংলগ্ন জয়পাহাড়ে নির্মিত হয়েছে ভবনটি। এই পাহাড়ের ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা পরিবেশে রয়েছে বিপিসি চেয়ারম্যানের ভবন। অন্য কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্যও ঘরবাড়ি রয়েছে এলাকাটিতে। চট্টগ্রামে রয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলসহ বিপিসির ৮টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। অথচ সবকিছু ফেলে বিপিসি সদর দপ্তরকে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশিষ্টজনরা। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য যেখানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর চট্টগ্রামে আনার গণদাবি রয়েছে, সেখানে বিপিসির মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড়কে দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন তারা। তারা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে।
সূত্রে জানা যায়, দেশের জ্বালানি তেলের একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিপিসি। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত। চট্টগ্রাম থেকেই সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন ৮টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলে আসছে। বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ৭০ লাখ জ্বালানি তেল আমদানি এবং সরবরাহের পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই অফিস থেকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রয়োজনীয় ক্রুড অয়েল আমদানি, ৮ হাজার কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসপিএম প্রকল্পসহ জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা রয়েছে চট্টগ্রামে।
বিপিসি বর্তমানে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ভবনে ভাড়া করা স্পেসে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে ভাড়া প্রদান ছাড়া বিশেষ কোনো অসুবিধা না হলেও বিপিসি নগরীর সার্সন রোডে জয়পাহাড়ের নিজস্ব জায়গায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ করে স্টিল স্ট্রাকচারের একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছে। ইতোমধ্যে ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ঈদের পর এই ভবনে বিপিসির সদরদপ্তরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় আবার হুট করে চট্টগ্রাম থেকে বিপিসির সদরদপ্তর সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি চিঠি চালাচালি হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। সংস্থার চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ ঢাকায় সদরদপ্তর নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ করা হয়, বিপিসির সদরদপ্তর চট্টগ্রামে হলে সংস্থার চেয়ারম্যান পারতপক্ষে চট্টগ্রামমুখো হন না। মাসে এক বা দুইবার চট্টগ্রাম ‘ভ্রমণে’ আসেন। বর্তমান চেয়ারম্যানও নিয়োগ পাওয়ার পর মাত্র দুইবার চট্টগ্রাম এসেছেন।
বিষয়টি আলোচনায় আসে সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে কার্যপ্রণালির ৭১ বিধি অনুসারে কুমিল্লা–৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জরুরি–জনগুরুত্বসম্পন্ন একটি নোটিশ প্রদান করে ‘জনস্বার্থে বিপিসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন জানান। একই সঙ্গে ঢাকায় বিপিসির স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করারও আহ্বান জানান তিনি। বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ১২ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান চিঠি দেন বিপিসির চেয়ারম্যানকে। জরুরি ভিত্তিতে এই বিষয়ে মতামত দেওয়ার কথা বলা হয় সেই চিঠিতে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়ে বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানা আরেকটি চিঠি ইস্যু করে বিপিসির ছয় বিভাগের একজন সিনিয়র জিএম এবং পাঁচজন জিএমকে চিঠি দিয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়। এসব কর্মকর্তা কী ধরনের মতামত দিয়েছেন তা জানা যায়নি।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বিপিসির চেয়ারম্যান এবং পরিচালকদের কেউই পারতপক্ষে চট্টগ্রামে আসতে চান না। তারা ঢাকায় লিঁয়াজো অফিসে অফিস করেন। যেখানে বিপিসির বাইরে গড়ে ওঠা জ্বালানি তেল সরবরাহকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানেরও অফিস রয়েছে। একই ব্যক্তির মালিকানাধীন ওই কোম্পানিগুলোকে বিপিসির ভিতরে আরেক বিপিসি বলেও প্রচারণা রয়েছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী গতকাল আজাদীকে বলেন, এটা খুবই খারাপ একটি খবর, অত্যন্ত দুঃখজনক। ভোটের সময় আমাদেরকে খুশি করার জন্য চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। অথচ কাজের ক্ষেত্রে সব উল্টাপাল্টা করা হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি সেক্টরকেন্দ্রিক দুর্নীতি অনিয়মের একটি বড় অভিযোগ সব সময় রয়েছে। বিপিসির প্রধান কার্যালয়কে ঢাকায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে হয়তো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ও থাকতে পারে। তিনি চট্টগ্রামকে জ্বালানির রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রতি বছর দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ৬০–৭০ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়। দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়। এই পুরো কার্যক্রমই চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। অথচ হেডকোয়ার্টার এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় চলছে। এটি চট্টগ্রামের সাথে ‘সৎমায়ের’ মতো আচরণ।
রাশিয়ার অনারারি কনসাল, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি তেল সেক্টরের সব কার্যক্রমই এখানে। অথচ হেডকোয়ার্টার নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকায়! এটা মেনে নেওয়া যায় না। কর্মকর্তাদের বসবাস এবং সুযোগ–সুবিধার কথা চিন্তা করে সরকার যদি এমন একটি পদক্ষেপ নেয় তবে তা আত্মঘাতী হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করা হবে বলে আমাদেরকে বিভিন্ন সময় আশ্বস্ত করা হয়েছে। অথচ সব হেডকোয়ার্টার এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। এই ধরনের পদক্ষেপে চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই দুঃখজনক। আমাদের সংবিধানে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। অথচ রেলওয়ের সদরদপ্তর এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন বিপিসি নেওয়ার তোড়জোড় করছে। সামনে হয়তো বিএসসিও নিয়ে যাবে। এটা তো বিকেন্দ্রীকরণ হলো না, কেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে, যা একটি রাষ্ট্রের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এই ধরনের আত্মঘাতী উদ্যোগ এখনই বন্ধ করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।










