বন বাঁচিয়ে ওরা পেলেন ‘লাভ’

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | শনিবার , ২৩ মে, ২০২৬ at ১০:১০ পূর্বাহ্ণ

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা জনপদ লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি। একসময় এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ছিল অবাধ গাছ কাটা, দখল আর জীবিকার চাপে বিপর্যস্ত। বন হারানোর সাথে সাথে কমে যাচ্ছিল বন্যপ্রাণীর বিচরণ, বাড়ছিল পাহাড় ধসের ঝুঁকি, বদলে যাচ্ছিল পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। সেই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে বন বিভাগ শুরু করেছিল সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি। যেখানে বন রক্ষার দায়িত্বে যুক্ত করা হয় স্থানীয়দেরকে। বছরের পর বছর গাছের বাগান পরিচর্যা ও বন সংরক্ষণে কাজ করা সেই মানুষগুলোর হাতেই এবার তুলে দেয়া হয়েছে কোটি টাকার লভ্যাংশের চেক। চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের আওতাধীন সামাজিক বনায়নের মেয়াদোত্তীর্ণ গাছের বাগান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের অংশ হিসেবে ৮০ জন উপকারভোগীর মাঝে এই অর্থ বিতরণ করেছে বন বিভাগ।

জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে রয়েছে এশীয় হাতি, বানর, মায়া হরিণ, অজগরসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এছাড়া গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, গামারিসহ নানা প্রজাতির বনজ গাছ এই বনকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও বন উজাড়ের কারণে এই অভয়ারণ্য হুমকির মুখে পড়ে। বন রক্ষায় কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয় বুঝতে পেরে বন বিভাগ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়। সেখান থেকেই সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির বিস্তার।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রকাশ্য নিলামে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের ৫৫ হেক্টর সামাজিক বনায়নের বাগান ২ কোটি ২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। উপকারভোগীর লভ্যাংশের পরিমাণ ৯০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। চুক্তি অনুযায়ী বিক্রির মোট রাজস্বের বনবিভাগ ৪৫ ভাগ, উপকারভোগী ৪৫ ভাগ ও বৃক্ষরোপন তহবিল ১০ ভাগ পান। এরমধ্যে ২০০৫০৬ সনে সৃজিত বাগানের পরিমাণ ১৫ হেক্টর। উপকারভোগীর সংখ্যা ১৫ জন। মোট বিক্রির পরিমাণ ৭১ লাখ টাকা। উপকারভোগীর লভ্যাংশের পরিমাণ ৩১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। জনপ্রতি উপকারভোগী পেয়েছেন ২ লাখ ১৩ হাজার টাকা। ২০০৬০৭ সনে সৃজিত বাগানের পরিমাণ ১৫ হেক্টর। উপকারভোগীর সংখ্যা ১৫ জন। মোট বিক্রির পরিমাণ ৬১ লাখ টাকা। উপকারভোগীর লভ্যাংশের পরিমাণ ২৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। জনপ্রতি উপকারভোগী পেয়েছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। ২০০৭০৮ সনে সৃজিত বাগানের পরিমাণ ২৫ হেক্টর। উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ জন। মোট বিক্রির পরিমাণ ৭০ লাখ টাকা। উপকারভোগীর লভ্যাংশের পরিমাণ ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। জনপ্রতি উপকারভোগী পেয়েছেন ৬৩ হাজার টাকা। বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছিল। বছরের পর বছর তারা সেই বাগানের পরিচর্যা ও সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে বাগান মেয়াদোত্তীর্ণ হলে গাছ বিক্রির লভ্যাংশের অংশীদার হয়েছেন তারা।

শুক্রবার (২২ মে) সকালে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের রেঞ্জ কার্যালয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানিকভাবে উপকারভোগীদের হাতে লভ্যাংশের চেক তুলে দেয়া হয়। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূর জাহান, ডুলাহাজার সাফারি পার্কের ইনচার্জ রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম ও চুনতি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ। সঞ্চালনায় ছিলেন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের বিট কর্মকর্তা চঞ্চল কুমার তরফদার। অনুষ্ঠানস্থলে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। চেক হাতে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, আবার কারো মুখে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর স্বস্তির হাসি।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূর জাহান জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় ধস রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই বন বড় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক বনায়নের মতো উদ্যোগ স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে বন যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বনপাড়ের মানুষের জীবনেও আসবে টেকসই পরিবর্তন। কারণ সবুজের যত্ন নিলে, সেই সবুজই একদিন ফিরিয়ে দেয় জীবনের নতুন সম্ভাবনা।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, সামাজিক বনায়নের মূল উদ্দেশ্য শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। মানুষ যখন বন থেকে বৈধভাবে উপকার পায়, তখন তারাই বন রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে উপকারভোগীদের মাঝে লভ্যাংশ বিতরণ তারই বাস্তব উদাহরণ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরপ্তানি হচ্ছে পাহাড়ের কাজু বাদাম
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশ সীমান্তে স্মার্ট নিরাপত্তা গ্রিড চালু করবে ভারত