নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! যে ছেলেরা একদিন মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে দূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন, গতকাল তারা ফিরেছেন কফিনে বন্দি হয়ে। কিন্তু তাদের মা ফরিদা বেগম সন্তানদের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না।
ওমানে গাড়ির ভেতর এসি এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারানো রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর রাঙ্গুনিয়া বন্দেরাজা পাড়ার একই পরিবারের চার প্রবাসী ভাইয়ের লাশ গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশে এসে পৌঁছেছে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মরদেহগুলো গ্রহণ করেন রাঙ্গুনিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। মরদেহ হস্তান্তরের সময় তিনি লাশবাহী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। পরে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
নিহত চার ভাই হলেন শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম। সাধারণত বিদেশ থেকে মরদেহ দেশে আনা দীর্ঘ প্রক্রিয়া হলেও দ্রুত সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহগুলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়ার অ্যাডমিরাল আজিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, উনার সাথে আমাদের প্রতিদিন যোগাযোগ ছিল। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এত দ্রুত ভাইদের মরদেহ আমরা স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। দ্রুত সহযোগিতার জন্য তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কেও ধন্যবাদ জানান। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের প্রতি পরিবারকে দাফন ও পরিবহন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যেন নির্বিঘ্নে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়াতে নেওয়া যায়।
আজ বুধবার ভোরে চার ভাইয়ের লাশ ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামে আসবে। এরপর বেলা ১১টার দিকে হোসনাবার লালানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তাদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। শুধু এই চার ভাইয়ের লাশ নয়, একইসাথে গত ১ মে ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মহসিনের লাশও আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গতকাল চার ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড বন্দেরাজা পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বন্দেরাজা পাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে পাশাপাশি খনন করা হয়েছে চারটি কবর। মসজিদের উঠানে রাখা হয়েছে চাঁটাইসহ কবরস্থ করার জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম এবং লাশের খাটিয়া। কবর খননসহ সব কাজে গ্রামবাসীর পাশাপাশি পুরো উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিয়েছেন। অনেককে খনন করা কবর দেখতেও আসতে দেখা গেছে। শোক ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। জানাজার মাঠে শামিয়ানা টাঙানোসহ আনুষাঙ্গিক কাজ শেষের দিকে।
চারজন রেমিট্যান্সযোদ্ধাকে হারিয়ে এখনো শোকে স্তব্ধ পুরো গ্রাম, পুরো উপজেলা। চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে স্বজন আর প্রতিবেশীদের শোকে।
এদিকে বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা ফরিদা বেগম এখনো জানেন না যে তার চার সন্তান আর ইহজগতে নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর চরম কষ্ট সহ্য করে পাঁচ সন্তানকে আগলে বেঁচে ছিলেন তিনি। সন্তানদের সুখের দিন যখন সমাগত, তখনই নেমে এলো অন্ধকার। কিন্তু আজ ভোরে যখন লালানগরের নিজ বাড়ির উঠানে ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্স এসে থামবে, যখন একে একে চারটি কফিন নামানো হবে, তখন এই অসুস্থ মা কীভাবে নিজের চার সন্তানের লাশ গ্রহণ করবেন? এই পাহাড়সম শোক কি তিনি সইতে পারবেন? এই প্রশ্ন এখন লালানগরের প্রতিটি মানুষের মুখে।
উল্লেখ্য, ওমানে দীর্ঘদিন ব্যবসা করে আসা চার ভাই গত সপ্তাহের মঙ্গলবার রাতে কেনাকাটা শেষে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় গাড়িতে ঘুমানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দুজন বিবাহিত এবং বাকি তিনজনের মধ্যে দুই ভাইয়ের বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা ও প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছিল।













