কয়েক বছর আগেও আমাদের বাবা–মায়েরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন মূলত কল করার জন্য। এখন সেই মানুষগুলোর হাতেই স্মার্টফোন। তারা ভিডিও কলে কথা বলেন, ইউটিউবে ওয়াজ শোনেন, ফেসবুকে নাতি–নাতনির ছবি দেখেন, বিকাশে টাকা পাঠান, অনলাইনেই বিল দেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ তাদের জীবনকে সহজ করেছে–কিন্তু একই সঙ্গে অদৃশ্য এক ঝুঁকির মধ্যেও ঠেলে দিয়েছে। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপদে ব্যবহার করার জ্ঞান সেভাবে বাড়েনি।
আজকাল প্রায়ই শোনা যায়– কেউ ‘বিকাশ অফিস’ পরিচয়ে ফোন করে পিন জেনে নিয়েছে, কেউ ওটিপি বলে দিয়েছে, কেউ আবার একটি ফিশিং–লিংকে ক্লিক করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, প্রতারকরা এখন আর আগের মতো সহজে ধরা পড়ে না। তারা ভদ্রভাবে কথা বলে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় দেয়, এমনকি অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের ভাষাও নকল করে।
আমাদের অনেক অভিভাবক এখনো বুঝে উঠতে পারেন না কোন ফোনকলটি সত্যি, কোনটি প্রতারণা। কারণ তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখেছেন প্রয়োজন থেকে, নিরাপত্তা বুঝে নয়। একজন মা হয়তো ভাবছেন, লোকটা এত ভদ্রভাবে কথা বলছে, প্রতারক হবে কেন? একজন বাবা হয়তো বিশ্বাস করে ফেলছেন, ব্যাংক থেকে ফোন দিয়েছে, সাহায্য করতেই তো চাচ্ছে। এই বিশ্বাস, এই সরলতাই এখন সাইবার ফ্রড–দের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
সমস্যাটা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক ও প্রজন্মগতও। আমরা তরুণরা খুব দ্রুত ডিজিটাল দুনিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের বাবা–মায়েদের অনেকেই এই পরিবর্তনের ভেতরে ঢুকেছেন হঠাৎ করে। তারা এন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করছেন, কিন্তু ফিশিং লিংক কী, ভুয়া এপ কেমন দেখতে, ব্রাউজারে কার্ড সংরক্ষণ রাখার ঝুঁকি কতটা– এসব অনেকেরই জানা নেই। আর এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা আমাদের। আমরা অনেক সময় ধরে নিই যে, এগুলা তো খুবই সাধারণ বিষয়! কিন্তু যিনি জীবনের বড় একটা সময় এনালগ পৃথিবীতে কাটিয়েছেন, তার কাছে ডিজিটাল প্রতারণার ধরন বোঝা এত সহজ নয়। একজন শিক্ষিত মানুষও স্ক্যাম এর শিকার হতে পারেন, যদি তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না রাখেন। আজকের দিনে ডিজিটাল লিটারেসি মানে শুধু ফেসবুক চালাতে পারা বা ইউটিউব দেখতে পারা নয়। এর মানে হলো– কোন লিংকে ক্লিক করা নিরাপদ, কাউকে ওটিপি বা পিন না দেওয়া, অচেনা অ্যাপ ইনস্টল না করা, দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবহার করা, এবং সন্দেহজনক ফোনকলকে প্রশ্ন করতে শেখা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের পরিবারে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা। যেমন আমরা ছোটবেলায় রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম শিখেছি, তেমনি এখন বাবা–মায়েদেরও শেখানো দরকার– ব্যাংক কখনো পিন চায় না, বিকাশ কখনো ওটিপি জানতে ফোন করে না, এবং ফেসবুক–এর সব বিজ্ঞাপন বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ প্রযুক্তি এখন শুধু তরুণদের বিষয় নয়। এটি সবার জীবনেই ঢুকে গেছে। আর ডিজিটাল পৃথিবী যদি ইনক্লুসিভ হতে চায়, তাহলে নিরাপত্তাটাও ইনক্লুসিভ হতে হবে। তা না হলে স্মার্টফোন হাতে থাকা মানুষগুলো কানেক্টেড তো হবেন, কিন্তু নিরাপদ হবেন না।
লেখক : লেকচারার, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ










