প্রসঙ্গ : কিডনি, ক্যান্সার ও হৃদরোগ এবং আগামী বাজেট

এম.এ. মাসুদ | শনিবার , ১৬ মে, ২০২৬ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ

মরণব্যাধি কিডনি, ক্যান্সার ও হৃদরোগ মানুষকে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিকভাবে দুর্বল এবং নিঃস্ব করে ফেলে। দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পক্ষে এসব রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ভীষণ দুরূহ। বিশাল খরচ সাপেক্ষ এসব রোগের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে মানুষ আর্থিকভাবে কপর্দকহীন হয়ে এক সময় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়ে। আর্থিক দুরবস্থার কারণে এসব রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের যাপিত জীবন মানবেতর পর্যায়ে নেমে আসে। আক্রান্ত ব্যক্তির যদি জীবনাবসান হয়, তবুও এসব পরিবারের আর্থিক অবস্থা পূর্বের পর্যায়ে ফিরে আসে না। আক্রান্ত ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তার স্বজনদের জন্য রেখে যান অসচ্ছল এবং অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ। কোন কোন পরিবার হয়তো তা কাটিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু অনেক পরিবার নিঃস্ব রিক্ত হয়ে কোনরকমে জীবন ধারণ করে।

পঁচিশ ত্রিশ বছর আগে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যে অবস্থায় ছিল বর্তমানে তা অনেকটা উন্নত এবং আধুনিক বলা যায়। আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা কোন কোন সময় অত্যন্ত জটিল কোন কোন রোগের চিকিৎসায় বা সার্জারীতে এমন অভাবনীয় সাফল্য দেখান যে, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়। আমাদের চিকিৎসক, নার্স এবং চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, রোগীর প্রতি যাঁরা তাঁদের দরদী মনের সবটুকু আন্তরিকতা ঢেলে দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেন। অভিযোগ আছে, কিছু কিছু ডাক্তার ও তাঁদের সহকারীরা রোগীর প্রতি মানবিক ও সহানুভূতিশীল হওয়ার পরিবর্তে বাণিজ্যিক মনোভাবাপন্ন হন, তা দেখে রোগী এবং তাঁদের স্বজনগণ বিস্মিত এবং ভীষণ বিরক্ত হন। ফলে এসব ডাক্তার রোগীদের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তখন রোগী এবং রোগীর পরিবার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন কয়েকটি পার্লামেন্টারী স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যগণ, তৎকালীন সরকারি দলের নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাগণ বিনা প্রয়োজনে ঘন ঘন বিদেশ সফরে যেতেন এবং সাথে নিয়ে যেতেন তাদের আত্মীয় পরিজনদের। এ সকল ব্যক্তিবর্গের বিদেশ সফরের কোন যৌক্তিকতা ছিল না। এভাবে অপচয়কৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি হৃদরোগ, কিডনী ও ক্যানসারের চিকিৎসার কাজে খরচ করা হত তাহলে এসব রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও গুণগত পরিবর্তন আসত। বর্তমান সরকারের আমলে যেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মত নেতা, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তারা জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ সফরে যেতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেগা প্রকল্পের নামে যেভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে তা চিরতরে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে অতীতে বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হতো, আগামী ২০২৬২০২৭ অর্থ বছরের বাজেটে তা এমনভাবে বাড়ানো প্রয়োজন যাতে দেশের চৌষট্টিটি জেলায় কিডনি, ক্যানসার ও হৃদরোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। কিডনি, ক্যান্সার এবং হৃদরোগের চিকিৎসা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। দেশের প্রত্যেক সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ সকল জেলার জেনারেল হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল সমূহে কিডনি, ক্যান্সার ও হৃদরোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্ণধারদের সমীপে আমি নিবেদন করতে চাই যে : ) সরকারের মন্ত্রী, আমলারা অসুস্থ হলে দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, ) আগামী দিনে জাতীয় বাজেট সমূহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ করা প্রয়োজন, ) কিডনি, ক্যান্সার এবং হৃদরোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল সমূহকে এসব রোগের চিকিৎসা প্রদানের উপযোগী করা, ) এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, ) সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা, ) সরকারি হাসপাতাল সমূহের ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও টাউটদালাল মুক্ত করা, ) দেশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলির রোগ নিরূপনী পরীক্ষার ফি অতি উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষার মান কঠোর নজরদারিতে আনা, ) প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকগুলির অতি উচ্চ মুনাফা অর্জনের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি দেওয়া, ) ডাক্তারদের অস্বাভাবিক বেশি ফি গ্রহণ রোধ কল্পে সরকার কর্তৃক ডাক্তারদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রিটির আলোকে ফি নির্ধারণ করে দেওয়া, ১০) অতীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করতে না পারার ব্যর্থতা থেকে উত্তরণ এবং ১১) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।

বর্তমান সরকারের প্রধান এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকদের কাছে অনুরোধ থাকবে, এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের কষ্ট, তাদের অসহায়ত্ব, চিকিৎসা খরচ বহনে তাদের অসামর্থতা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে আগামী দিনের বাজেট সমূহে এই তিন রোগের জন্য জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা নিশ্চিত করুন। কিডনি, ক্যান্সার আর হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষ এবং তার স্বজনদের অন্তর নিঃসৃত দীর্ঘশ্বাস আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের হৃদয় এসব অসহায় মানুষের জন্য করুণায় এবং মমত্ববোধে সিক্ত হবে এবং তাঁরা এসব অসহায় মানুষের সুচিকিৎসায় মনোযোগী হবেন এই বিশ্বাস দেশবাসী নিশ্চয় পোষণ করতে পারে।

লেখক : বর্ষীয়ান নাগরিক ও সমাজকর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঐক্য, সহমর্মিতা ও সুশৃঙ্খল উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি ‘আরাসকা’
পরবর্তী নিবন্ধটেনশনে হাইপারটেনশন -সুখে উপশম