‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বিশ্বের উষ্ণায়ন, করোনা তথা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মহামারী মানুষের এই পৃথিবীতে বসবাস বা টিকে থাকাকে যেমন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে তেমনি যুদ্ধও বিশেষ করে বর্তমানের আমেরিকা–ইসরাইলের অন্যায়ভাবে ইরান আক্রমণ পুরা বিশ্বকে তথা পুরা মানবজাতিকে তার অস্তিত্বের ক্রম হুমকিতে নিপতিত করেছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, লিওন প্যানেটা এক সময়ের আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ’র পরিচালক এবং পরবর্তীতে আমেরিকান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি বেশ কয়েকজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেছেন। এর মাঝে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন এবং বারাক ওবামা উল্লেখযোগ্য। কয়েকদিন আগে কমনওয়েলথ এসোসিয়েশন ক্লাব এর এক আলোচনায় লিওন প্যানেটার বক্তব্য শুনেছি। তার বক্তব্যে তার দায়িত্ব পালনকালীন অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি উল্লেখ করেছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা তার মন্ত্রী বর্গ, নিরাপত্তা উপদেষ্টা তথা নীতি নির্ধারণী ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনে সেরাদের মধ্য থেকে সেরাদেরই নিয়োগ দেন। কোন বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেওয়ার আগে নিয়োগপ্রাপ্ত সেই সেরারা নিজেদের মাঝে বার বার আলোচনা করেন, আলোচ্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিমত থাকলে একমতে আসার জন্য যুক্তি তর্কে অবতীর্ণ হন। অতপর প্রেসিডেন্টের কাছে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন। এরপরও উত্থাপিত বিষয়ে প্রেসিডেন্টের কোন প্রশ্ন বা দ্বিমত থাকলে তিনি তা তুলে ধরেন। এসব কিছুর পর একটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ পর্যায়ে প্যানেটা মন্তব্য করেন, বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশে পাশে তেমন কোন উপদেষ্টা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। বরং প্রতীয়মান হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চলেছেন। এ যদি না হত তা হলে তিনি তার মেয়ের জামাই কুশনার, যিনি কিনা নিউইয়র্কের প্রতিষ্ঠিত একজন রিয়েল স্টেট তথা জমি জমার ব্যবসায়ী, যার কোন কূটনৈতিক কার্যক্রমের অতীত অভিজ্ঞতা নাই তাকে যেখানে ভূ–রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পারমাণবিক বিষয়াদির মত স্পর্শ কাতর বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে সেখানে ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে আসার আলোচনায় পাঠান কী করে?
প্যানেটা আরো উল্লেখ করেন, ‘যে কোন মিশনে আমেরিকান সৈন্যদের জড়িত করার আগে নির্দিষ্ট করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে, এই মিশনে আমাদের লক্ষ্য বা অবজেকটিভ কী? সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কি না? মিশন সমাপ্তিতে সৈন্যদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে’। ইরানের ক্ষেত্রে এগুলির কোনটিই গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্যানেটার কাছে মনে হয়নি।
প্যানেটার উত্থাপিত এসব বিষয়কে আরো জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছেন আমেরিকান আইন প্রণেতারা তাদের বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে।
জর্জিয়ার সিনেটর ওসাফ তার সাম্প্রতিকের এক বক্তব্যে ইরান যুদ্ধে সৃষ্ট হরমুজ প্রণালীকে নিয়ে সংকটকে A geo-strategic and economic calamities অর্থাৎ এ সংকটকে ভূ–রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুর্যোগ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
এখন এ দুর্যোগে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অর্থনীতির অবস্থা এখন অনেকটা লণ্ডভণ্ড। হাওড়ের ধান কাটার মেশিন চলছে না জ্বালানীর অভাবে, শিল্প কারখানার উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সংকটে, সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক করাল ছায়া কেবলি প্রলম্বিত হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের লক্ষ লক্ষ পরিশ্রমী মানুষেরা শঙ্কায় কর্ম হারানোর। এ অবস্থা পৃথিবীর অন্যান্য দেশেরও।
সান্দিয়াগো থেকে নির্বাচিত আইন প্রণেতা সারা জ্যাকব মানুষের জন্য দুর্যোগ দুর্ভোগ ডেকে আনা এ যুদ্ধে জড়ানোতে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সিনেটের এক শুনানীতে সারা জ্যাকব তীব্র ভাষায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পি হ্যাগসেথ কে আক্রমণ করে তার সামনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যিশুর বেশে আবির্ভূত হওয়ার ছবি তুলে ধরে প্রশ্ন করেন ‘যে প্রেসিডেন্ট যিশু খ্রীস্ট’কে নিয়ে এমন কীর্তি করতে পারেন, তিনি আদৌ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ হিসাবে দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে পারেন কিনা সে প্রশ্ন আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষেরা আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন’।
জ্যাক সুলিভান এক সময়ের আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, ‘দি লং গেইম’ বইয়ের রচয়িতা এবং বর্তমানে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব পাবলিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশনে অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত, যিনি প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে জুলাই ২০১৫ সালে ইরানের সাথে ‘জে সি পি ও এ’ ( জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্লান অব এ্যাকশন) চুক্তি প্রণয়নে অন্যতম ভূমিকা পালনকারী তার সাম্প্রতিক মন্তব্য দুর্বল এবং ভেঙে পড়া একটি ইরান ইসরাইলের কাম্য কিন্ত্তু আমেরিকার জন্য সেই একই লক্ষ্য কাম্য নয়, এর পরও আমেরিকা সে লক্ষ্যে ইরান যুদ্ধে জড়িয়েছে। চীন আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়িয়েছে এতে মহাখুশি, কারণ এতে বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান দুর্বল হচ্ছে অথচ আমেরিকা জানে না কেন সে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে’!
এক হিসাবে দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ৮০০(আটশত) সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি স্থাপন করার পিছনে যুক্তি আমেরিকার প্রতিরক্ষা নয়, বরং সামরিক শক্তি প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে দেশে আমেরিকার প্রভূত্ব স্থাপন। হয়তো প্রভূত্ব স্থাপন লক্ষ্যেই এখন আমেরিকার ইরান যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমেরিকা তার সামরিক প্রতিপত্তি প্রমাণে তিনটি রণতরী ১২ টি সহযোগী যুদ্ধ জাহাজ, ২০০ (দুই শত) যুদ্ধ বিমান সহ ১৫০০০ (পনের হাজার) সৈন্য পারস্য উপ সাগর সহ সন্নিহিত অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। তবে এতকিছুর পরও বেহেসেবি আমেরিকানরা এবার হয়ত বেকায়দায়! প্রুশিয়ান তথা জার্মানীর বিখ্যাত সমর তত্ত্ববিধ কার্ল ভন ক্লউইজ তার বিখ্যাত বই ‘ON War’ এ উল্লেখ করেছেন ‘The war is a continuation of politics’ অর্থাৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের ক্রম পন্থাই হল যুদ্ধ। ইরান যুদ্ধে আমেরিকার রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল শাসকশ্রেণি তথা রিজিম চেঞ্জ। এতে আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছে চূড়ান্তভাবে। অন্যভাবে বলা যায় ইরান যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত!
ইরান এটাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমঝোতায় উপনীত হতে আমেরিকার সামনে বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য
ক। ৩০ দিনের মধ্যে বর্তমানের অস্থায়ী যুদ্ধ বিরতি স্থায়ী রূপ দেওয়া।
খ। হরমুজ প্রণালী থেকে উভয় পক্ষের অবরোধ তুলে নেওয়া।
গ। ইরানের উপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করা।
ঘ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যৎ অনাক্রমণ নিশ্চয়তা প্রদান।
ঙ। লেবানন সহ এতদঞ্চলে যুদ্ধ তথা আক্রমণ পরিচালনা না করা।
চ। পারমাণবিক বিষয়ে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রস্তাবকে উৎসাহব্যঞ্জক নয় বলে মন্তব্য করেছেন। একই সাথে এটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন।
এরই মাঝে আমেরিকা হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া ১০০০ (এক হাজার) জাহাজ এবং এর ২০০০০ ( বিশ হাজার) নাবিককে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর উদ্যোগ হিসাবে ‘অপারেশন ফ্রিডম’ নাম দিয়ে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল অবাধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে ইরান এই উদ্যোগে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং গমনদ্যোগী জাহাজে আক্রমণ পরিচালনা করে। এতে দুদেশের উত্তেজনার পারদ চরমে উঠে।
এ অবস্থায় মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে এ যুদ্ধের শেষ কোথায়? পাকিস্তানী স্বনামধন্য কূটনীতিক মালিহা লোধী এ প্রসঙ্গে বলেন ‘ইরান এবং আমেরিকা দুপক্ষই যুদ্ধ বন্ধে এমন এমন শর্ত দিচ্ছেন যা অপর পক্ষ মনে করছে অগ্রহণযোগ্য, মেনে নিলে হেরে গেলাম। এমন একটি অবস্থায় অনিশ্চয়তায় বর্তমান বিশ্ব’। সম্প্রতি ফাইনেন্সিয়াল টাইমস এর এডওর্য়াড লুস লিখেছেন ‘দীর্ঘ সময় ধরে কৌশলগত জলপথ হরমুজ বন্ধ রেখে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল প্রয়োগ করে যেতে পারে’। অন্যদিকে ‘গানবোট কূটনীতির মাধ্যমে আমেরিকা ইরানী বন্দরগুলি অচল রেখে অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে শ্বাসরোধ করার কৌশল নিয়েছে আমেরিকানদের ধারণা এতে ইরান আমেরিকার শর্ত মানতে বাধ্য হবে’। এ মনস্ত্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি থেকে দুটি দেশ যতক্ষণ না বেরিয়ে আসছে ততক্ষণ এ যুদ্ধাবস্থা থেকে বিশ্ববাসী পরিত্রাণ পাবে বলে মনে হয় না।
এরপরও ইতি উতি করে ইরান যুদ্ধ একদিন আমেরিকা ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দিবে। কিন্ত্তু বিশ্বব্যাপী মানুষের এই যে দুর্গতির সৃষ্টি, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা এসব আমেরিকার বিপক্ষে মানুষকে সব সময় অবস্থান নিতে প্রণোদিত করবে।
ইতিপূর্বে ২২ জুন ২০২৫ ‘অপারেশন মিড নাইট হ্যামার’ অতঃপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুরু করা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নানা নামে আমেরিকানরা ইরানের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে। সর্বশেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘অপারেশন ফ্রিডম’ স্থগিত ঘোষণা করেছেন।
উইন্ডি সারম্যান একসময়ে আমেরিকার উপ–পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন, আমেরিকার পক্ষ হয়ে অনেক দূতিয়ালী করেছেন তার কথা দিয়ে শেষ করছি। সবদেখে শুনে তিনি বলেছেন ‘President Trump is using Madman theory, he is having tactics but no strategy’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ম্যাডম্যান তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন, তার আছে স্বল্প মেয়াদি লক্ষ্য কিন্ত্তু সদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনা নাই। ‘ম্যাডম্যান তত্ত্ব’এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ভিয়েতনামীদের ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করতেন। এই তত্ত্বের সারমর্ম হল, এটা করব সেটা করব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব, ধূলিস্যাৎ করে দিব, নির্মূল নিঃশেষ করব! আসলে বাস্তবে এর কিছুই করা হয় না।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












