ডাকঘর

রেজাউল করিম | বুধবার , ৬ মে, ২০২৬ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাসাহিত্যের সব শাখায় অবাধে বিচরণ করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে লেখা গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ড. ইউলিয়াম রাদিচের কথায় জানা যায়, তখনকার দিনে ইউরোপবাসীরা বিশ্বাস করতোরবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করতেন। তিনি যে বাংলা সাহিত্যে এতো কিছু সৃষ্টি করেছেনসেটা তারা জানতো না।

রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় কবিদের কবি। তিনি আমাদের জাতীয় সঙ্গীতেরও রচয়িতা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সভ্যতাসংস্কৃতি, কৃষ্টিকালচার, মাটি ও মানুষের কবি। তাই শিশুরা তার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়নি। শিশুদের জন্যে তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গান, গল্প নাটকসহ নানা রকম শিশুতোষ রচনা। নিতান্ত অল্প বয়সে জ্ঞান নন্দিনী দেবীর পরিচালনায় প্রকাশিত ‘বালক’ পত্রিকা লেখার ভার অনেকটাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ফলে সৃষ্ট হয়েছে ছড়া আর গল্পের পসরা। জীবনের শেষ পর্যায়েও আরো মনোযোগ আর দরদের সঙ্গে শিশুসাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ শিশুদের জন্যে প্রচুর লিখেছেন। শিশু, শিশু ভোলানাথ, খাপছড়া, ছড়া ও ছবি, গল্পসল্পকল্পনা, সহজ পাঠ ইত্যাদি অসংখ্য ছড়া ও কবিতা গ্রন্থ তিনি শিশুদের জন্যে রচনা করেছেন। কবিগুরু ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

কবিগুরুর অনবদ্য সৃষ্টি ডাকঘর নাটক, যেটি রচিত হয় ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে। ডাকঘর রবীন্দ্রনাথের সাংকেতিক নাটকগুলির মধ্যে সম্ভবত সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়, যা দেশে তো বটেই, বিদেশেও অনূদিত ও অভিনীত হয়েছিল। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে দেবব্রত মুখোপাধ্যায় দ্য পোস্ট অফিস নামে এর অনুবাদ করেন। ভূমিকা লেখেন কবি ইয়েটস্‌।

অমল’ নামে একটি ছয়সাত বছরের ছেলে, তারই ক্ষয় অবসন্নতা ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এই নাটক। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে, ক্লান্তি ও অসহায়তার মধ্যে, তার মনটি কেমন উজ্জ্বল চঞ্চলতায় দেশবিদেশ পরিক্রমায় ছুটে যেতে চাইছে, এই দ্বন্দ্ব সমগ্র পরিসর জুড়ে ফুটিয়ে তোলেন রবীন্দ্রনাথ। নাটকে মৃত্যুর উপস্থিতি প্রতীকী, মুক্তির কথাটা এসেছে ব্যঞ্জনায়। রাজার ডাকঘর, ডাকঘরের নানা ডাকহরকরা এবং তাদের বয়ে নিয়ে আসা রাজার চিঠি, সবই এই প্রতীকের অঙ্গ। শান্তিনিকেতনে মাত্র তিন দিনের শ্রমেঘামে ডাকঘরের সৃষ্টি। ডাকঘর রচনাকালে তিনি পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ একজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। এরই মধ্যে তিনি রক্ত সম্পর্কের ও প্রাণের সম্পর্কের যেসব পারিবারিক সদস্যদের হারিয়েছেনমা সারদা দেবী, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, স্ত্রী মৃণালিনী, কন্যা রেণুকা, পিতৃদেব, প্রিয়তম পুত্র শমীন্দ্রনাথ প্রমুখ। এসব নিকটজনের মৃত্যুশোক কবির জন্য ছিল অস্তিত্বের ওপর অপঘাত। তন্মধ্যে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ। উপর্যুপরি এতগুলো মৃত্যু ঘটনাজনিত শোককে রবীন্দ্রনাথ শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তন্মধ্যে ডাকঘরের অমলের প্রায় সমবয়সী শমীন্দ্রনাথের অকাল মৃত্যুর ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করে। সম্ভবত শমীর মৃত্যুর সঙ্গে মিলিয়ে অমলের মৃত্যুর ভাবনাও অসংগত মনে হয় না।

ডাকঘরের গ্রন্থ পরিচয় অংশে রচয়িতার বক্তব্য, ‘ডাকঘর রচনাকালে আমার মনের মধ্যে বিচ্ছেদের বেদনা ততটা ছিল না। ডাকঘর যখন লিখি তখন হঠাৎ আমার অন্তরের মধ্যে আবেগের তরঙ্গ উঠেছিল। চল চল বাইরে, যাবার আগে তোমাকে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে হবে, সেখানকার মানুষের সুখদুঃখের উচ্ছ্বাসের পরিচয় পেতে হবে। রাত দুটোতিনটের সময় অন্ধকার ছাদে এসে মনটা পাখা বিস্তার করল। আমার মনে হচ্ছিল একটা কিছু ঘটবে, হয়তো মৃত্যু। কোথাও যাবার ডাক ও মৃত্যুর কথা প্রকাশ করলুম।’

১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই সেসময় পোল্যান্ড হিটলার বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। চলছে নাৎসি সন্ত্রাস। ইয়ানুশ কোরচাক সিদ্ধান্ত নিলেন রবীন্দ্রনাথের নাটক ডাকঘর পোলিশ অনুবাদে পোচতা মঞ্চস্থ করবেন। শুধু শিশুদের নিয়ে হবে সেই নাটক। মৃত্যুপথযাত্রী এক বালকের গল্প, আসন্ন মৃত্যুকে যে বরণ করছে আবিষ্কারের আগ্রহে, প্রাত্যহিক কৌতূহলে ও বিমল আনন্দে। সেই আনন্দ এইসব অনাথ শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হোক, এই বিশ্বাস থেকে ওয়ারশ নগরীতে ডাকঘর মঞ্চস্থ হয়।

বাংলাদেশে ডাকঘর অবলম্বনে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন অভিনেতা লুসি তৃপ্তি গোমেজ। যিনি পার্শ্ব চরিত্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সরকারি অনুদানে ২০১৪ সালে নির্মিত হয়। দৃশ্যায়ন হয় সোনারগাঁও উপজেলার সনমান্দি গ্রাম, খাগড়াছড়ি ও টেকনাফে। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় ব্যান্ডদল মেঘদল। ডাকঘর স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটি নির্মাণ করতে সময় লাগে ৩ বছর ৯ মাস। মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। ৪৬ মিনিটের চলচ্চিত্র এটা। ১৯৬৫ সালে হিন্দি ভাষায় ডাকঘর চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ছবিটি পরিচালনা করেন জুল বেল্লানি। প্রযোজক : চিল্ড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি। অভিনয়ে : বলরাজ সাহানি, মুকরি, সচিন। সুরকার মদনমোহন আর গীতিকার ছিলেন কাইফি আজমি। এটি ৬০ মিনিটের। বহুদেশে বহু ভাষায় ডাকঘর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম আজও প্রাসঙ্গিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখোকা মায়ের কাছে
পরবর্তী নিবন্ধকাপ্তাই সড়ককে চার লেনে রূপান্তর করা হবে