আমরা তো হারিনি, পদত্যাগের প্রশ্ন কেন উঠছে : মমতা

ইস্তফা না দিলে কী ঘটবে তা নিয়ে আলোচনা

| বুধবার , ৬ মে, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে ধরাশায়ী হওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, তার দল ‘হারেনি’, সুতরাং তিনি পদত্যাগ করবেন না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। মমতা মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা না দিলে কী ঘটবে, সেই প্রশ্নও আসছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে নির্বাচনে হারার পরও পদত্যাগ না করতে চাওয়ার নজির নেই। খবর বিডিনিউজের।

আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার কলকাতায় নিজের কালীঘাটের বাড়িতে দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতা। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে মমতা সাফ বলে দেনতিনি রাজ্যের লোকভবনে গিয়ে পদত্যাগ করবেন না। তার ভাষায়, ‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’ হারের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ‘ভিলেন’ আখ্যা দিয়ে মমতা দাবি করেন, কমিশনের সাহায্যে একশর বেশি আসন ‘লুট’ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ওরা (বিজেপি) এমনি জিতলে আমার কোনো অভিযোগ থাকত না। ভোটে হারজিত থাকেই। কিন্তু তা তো হয়নি। আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের নির্বাচিত নেতারা তৃণমূলের পাশে আছেন দাবি করে মমতা বলেন, ‘আমাদের এই লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল। কমিশনই ভিলেন। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে। ভোটের আগে সব জায়গায় রেইড করেছে। সব অফিসারকে বদলে দিয়েছে। বিজেপি আর কমিশনের মধ্যে বেটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’ নির্বাচনে হারের পর দলের ‘কৌশল’ কী হবে, কোন পথে এগোবেন, তা আপাতত গোপনেই রাখতে চান মমতা। এখনই এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলবেন না তিনি। মমতা বলেন, ‘এত দিন আমি চেয়ারে ছিলাম। অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ। সাধারণ মানুষ। আর সহ্য করব না। সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমি রাস্তার লোক। রাস্তায় ছিলাম, রাস্তায় থাকব।’ এরইমধ্যে বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গী কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, আম আদমি দলের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে, উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ফোন করে সমবেদনা ও পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন বলে মমতার ভাষ্য। ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী করার কথাও বলেন মমতা।

নির্বাচনের পর তৃণমূল সমর্থক নারীদের বিজেপি কর্মীরা ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে মমতা বলেন, ‘এটা কোনো দল করতে পারে? ভাবা যায়? আমরা যখন জিতেছিলাম, বলেছিলাম, কারও উপর যেন অত্যাচার না হয়। সিপিএমের কোনো পার্টি অফিসে আমরা হাত দিইনি। অত্যাচার করিনি।’ সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন তার ভাইয়ের ছেলে ও দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

পদত্যাগ না করলে কী হবে: আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সোমবার দুপুরেই ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়া যখন শুরু করেছিল তখনই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখন লোকভবনে যাবেন? কখন ইস্তফা দেবেন? কারণ সেটাই রীতি। মমতার আগের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীরা তেমনই করে এসেছেন।

মমতা যখন সোমবার রাতে কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ভোট গণনা কেন্দ্র থেকে বের হলেন, অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, এর পরে তিনি লোকসভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে ইস্তফাপত্র তুলে দেবেন। কিন্তু মমতার কনভয় চলে যায় কালীঘাটে তার বাড়ির পথে। ভোটে হারার পর মুখ্যমন্ত্রী যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করেন, তখন কী হবে সে বিষয়ে ভারতের সংবিধানে কিছু বলা নেই। কারণ এমন পরিস্থিতির যে উদ্ভব হতে পারে, তা কেউ ভাবেননি। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞেরা বেশ কিছু ধারণার কথা বলছেন, যা অতীতে কোনো না কোনো রাজ্যে ঘটেছে। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না দেওয়ার নজির দেশে নেই। ফলে মমতা শেষ পর্যন্ত ইস্তফা না দিলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন নজির তৈরি হবে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে বৃহস্পতিবার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু ৭ মে পার হলেই তার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী।

এনডিটিভি লিখেছে, তৃণমূল নেত্রী মমতা মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে না দাঁড়ালে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হলেও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এর প্রয়োজন নাও হতে পারে। কারণ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিজয়ী দল যদি সরকার গঠনের দাবি জানায় এবং রাজ্যপাল তাদের আমন্ত্রণ জানান, তাহলে এই সাংবিধানিক সংকটের সমাধান সম্ভব। এদিকে নির্বাচনে জয়ের পর বিজেপির নতুন সরকারের শপথ কবে হবে তা মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত দলটি আনুষ্ঠানিক ভাবে জানায়নি। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, বিজেপি ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথগ্রহণের কর্মসূচি করতে পারে। রাজ্য বিজেপির নেতাদের কথাতেও তেমই ইঙ্গিত পাওয়ার কথা বলেছে আনন্দবাজার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউখিয়ায় দুর্বৃত্তের গুলিতে রোহিঙ্গা নেতা নিহত
পরবর্তী নিবন্ধইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়িতে ঋণ মিলবে ৮০ লাখ টাকা