শব্দনিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে

| রবিবার , ৩ মে, ২০২৬ at ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ

দেশের ৫২৬টি স্থানে জরিপ চালিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রার শব্দদূষণ রেকর্ড করা হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতাল এলাকায়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকার পল্লবীর সিরামিক রোড এলাকা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা যায়। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের বেসরকারি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল (বিবিএমএইচ) এলাকায় দিনের বেলায় সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ১১০ দশমিক ৯০ ডেসিবল। রাতে সর্বোচ্চ শব্দদূষণ পাওয়া গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় ১০০ দশমিক ৮০ ডেসিবল। উল্লেখ্য, সাধারণ মানুষের জন্য শব্দের ‘মানমাত্রা’ ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল নীরব এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও সেখানে শব্দদূষণের উচ্চমাত্রা পাওয়া হতাশাজনক। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২২ থেকে ২০২৫ সময়কালে দেশের ৬৪টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ ৫২৬টি পয়েন্টে শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রকল্প’র আওতায় এ জরিপ পরিচালিত হয়। এ জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ছাড়া ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী জেলায় বেশ কয়েকটি এলাকা শব্দদূষণের উচ্চঝুঁকিতে আছে। যানবাহনের চাপ, হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন শব্দ সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দূষণের মাত্রা বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে নগরী এলাকায় শব্দদূষণ ক্রমেই বাড়ছে। নির্মাণকাজে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ও হাইড্রোলিক হর্ন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, উচ্চশব্দের জেনারেটর, আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক, সাউন্ডবক্সের অতিরিক্ত ব্যবহার শব্দদূষণের প্রধান কারণ। বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরীতে যানবাহনের চাপ ও অহেতুক হর্নের কারণে শব্দদূষণ পরিস্থিতি বেশি খারাপ, যদিও জেলা বা উপজেলা শহরে তুলনামূলকভাবে শব্দদূষণের মাত্রা কম।

চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের শ্রুতিসীমার বাইরে যেকোনো উচ্চশব্দই শব্দদূষণ, যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া তীব্র শব্দে প্রাণী ও জলজ জীবের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

শব্দদূষণ এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একটি নীরব ঘাতক হিসেবে বিবেচিত এই শব্দদূষণ শুধু চট্টগ্রাম বা রাজধানীতে নয়, সারাদেশে এটি চলছে দোর্দণ্ডপ্রতাপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসের মাধ্যমে সহনক্ষমতার অধিক তীব্র বা তীক্ষ্ণ, বিশেষ করে সুরবর্জিত শব্দের উপস্থিতিতে মানুষ তথা জীব পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়, তাকেই শব্দদূষণ বলা হয়।

অপরিণামদর্শী মানুষ তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ ঘটিয়ে চলেছে। মানবসত্যতার বিকাশমান ধারায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পের দ্রুত প্রভাব, পরিবহনের অবাধ প্রবাহ প্রতিনিয়ত সুরবর্জিত শব্দের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ফলে শব্দদূষণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে শব্দদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস পরিবহন। মাত্রাধিক ডিজেল ইঞ্জিনচালিত বাস, ট্রাক, কার, মোটর সাইকেল থেকে উত্থিত অনিয়ন্ত্রিত শব্দ পরিবেশ দূষণেরও অন্যতম কারণ। এছাড়া এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চতীব্রতাসম্পন্ন হাইড্রলিক বা বৈদ্যুতিক হর্ন হচ্ছে শব্দদূষণের প্রধান উৎস। স্কুলকলেজ, হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর স্থানেও এসব তীব্র শব্দের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দ দূষণ কোনো সামান্য পরিবেশগত অসংগতি নয়; এটি এক নীরব মৃত্যুঝুঁকি। নগর সভ্যতার উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক নিরাপত্তা যেন বিসর্জিত না হয় এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের দায়িত্ব। শব্দদূষণ প্রতিকার শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, সম্মিলিত দায়িত্ববোধের মাধ্যমেই সম্ভব। সরকারকে একদিকে যেমন কার্যকর শব্দনিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং, জরিমানা ও জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, তেমনি নগর পরিকল্পনায় নীরব জোন সংরক্ষণ ও প্রযুক্তি নির্ভর শব্দ পরিমাপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে জনগণের দায়িত্ব হলো অহেতুক হর্ন ব্যবহার পরিহার করা, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অনুমোদিত শব্দমাত্রা মানা, শব্দ দূষণ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আইনগত সহায়তা নেওয়া এবং সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে সচেতন আচরণ গড়ে তোলা। সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই কেবল সুফল বয়ে আনতে পারে। মনে রাখতে হবে, শব্দ কমানো মানে শুধু কানে শান্তি দেওয়া নয়, বরং ‘আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, মননশীল ও মানবিক পরিবেশ উপহার দেওয়া।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে