যুক্তরাষ্ট্র ‘কোনো চুক্তি বা সন্ধির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয় বলে প্রমাণ দেখা যাচ্ছে’, যে কারণে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ‘সম্ভবত’ ফের শুরু হবে, এমনই ধারণা করছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইরান যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক সদরদপ্তরের উপপ্রধান মোহাম্মদ জাফর আসাদি বলেছেন, মূলত সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি কাড়ার লক্ষ্যেই মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব পদক্ষেপ ও বিবৃতি, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রথমত তেলের দাম যেন না পড়ে তা আটকানো এবং দ্বিতীয়ত সেই বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসা যা তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে। আমেরিকানদের যে কোনো নতুন দুঃসাহস বা বোকামির জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত। খবর বিডিনিউজের।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এশিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার ওপরই ‘এ অঞ্চলের দেশগুলোর স্বস্তি, কল্যাণ ও অগ্রগতি’ নির্ভর করছে। মন্ত্রণালয়টির সংসদীয় বিষয় ও আইন সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক হোসেইন নওশাবাদি বার্তা সংস্থা ইসনাকে বলেছেন, ভূ–রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘সম্পদের’ ওপর সবসময়ই বিদেশিদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল, কিন্তু এই ‘কৌশলগত সম্পদ’ ইরানের ‘পরিচয় ও সভ্যতার’ অংশ। পর্তুগিজ, ডাচ ও ইংরেজদের পারস্য উপসাগর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ‘বীরত্ব ও ত্যাগের’ ইতিহাস তুলে ধরে তিনি ‘ইরান এখন বিশ্বগ্রাসী আমেরিকার সামরিক দুঃসাহসও মোকাবেলা করবে’ বলে আশ্বাস দেন।
ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে : এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধবিরতি ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা ‘সমাপ্ত’ করেছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন নেই, নিজের এই যুক্তিকে আরও জোরালো করতে গিয়ে এমন কথা বলেছেন তিনি। রয়টার্স জানায়, গত শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সঙ্গে কোনো গুলি বিনিময় হয়নি। তিনি বলেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ শুরু হওয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলুশন’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান চালাতে পারেন, আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তা বিষয়ে অনিবার্য সামরিক প্রয়োজনে’ কংগ্রেসের অনুমতি প্রার্থনা বা সময় আরও ৩০ দিন বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন। দুই মাস আগে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার ৪৮ ঘণ্টা পর ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসকে যুদ্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন। তারপর থেকে শুরু হওয়া ৬০ দিনের সময়সীমা ১ মে শেষ হয়েছে। তারিখটি এগিয়ে আসার সময় কংগ্রেসের সহাকারী ও বিশ্লেষকরা জানান, তারা ধারণা করছেন ট্রাম্প সময়সীমাটি এড়িয়ে যাবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার জানান, এক্ষেত্রে যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের সময়সীমাটি প্রযোজ্য হবে না বলে অভিমত তাদের প্রশাসনের।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যুদ্ধ ক্ষমতা আইনটিকে অসাংবিধানিক বলে বিবেচনা করেন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট, উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই এই আইনটি সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করেছে, এমন যুক্তি তুলে এটি সংবিধান লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি।
শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা একটি যুদ্ধবিরতিতে ছিলাম, তাই এটি আপনাকে অতিরিক্ত সময় দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্পের এই যুক্তি বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, ১৯৭৩ সালের ওই আইনে যুদ্ধবিরতিকে অনুমোদন দেওয়ার মতো কিছু নেই। আর ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অব্যাহত মার্কিন নৌ–অবরোধ শত্রুতা চলার প্রমাণ, যুদ্ধবিরতির না।
মার্কিন সেনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য সেনেটর জিন শাহিন এক বিবৃতিতে ওই সময়সীমাকে ট্রাম্পের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘একটি পরিষ্কার আইনি সীমা’ বলে অভিহিত করে বলেছেন, সংঘাতের ৬০ দিন পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এই দুর্বলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার কোনো কৌশল বা উপায় নেই। এই ডেমোক্র্যাটরা চান, যুদ্ধ চালিয়ে নিতে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি নিতে আসুক।
কংগ্রেসের কাছে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই সংঘাতের সমাধান নাও হতে পারে। ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও এর সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি ‘উল্লেখযোগ্য’ হুমকি হয়ে আছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
এছাড়া ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ–অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। কয়েকদিন আগে সাগরে মার্কিন বাহিনী ইরানের কয়েকটি জাহাজ জব্দ করে, সে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন; জানিয়েছে রয়টার্স। ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, আমরা জাহাজটি দখল করে নেই, আমরা পণ্যসম্ভার নিয়ে নেই, তেল নিয়ে নেই। এটি খুব লাভজনক ব্যবসা। আমরা জলদস্যুদের মতো। আমরা অনেকটা জলদস্যুদের মতো কিন্তু আমরা খেলা খেলছি না।
ইরানের বন্দরগুলো ছেড়ে যাওয়ার পর তেহরানের কিছু জাহাজ জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব জাহাজের মধ্যে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি পণ্যবাহী জাহাজ ও এশিয়ার জলসীমায় আটক করা একটি ইরানি তেল ট্যাংকার রয়েছে।
শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য পাকিস্তানি মধ্যস্থতকারীদের কাছে তেহরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প দ্রুততার সঙ্গে ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।














