বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি কোনো সম্মান আসে না বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, অনেকে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সম্মান দেখান; আমি এটা পারি না। কারণ, এই সংবিধানকে পরিবর্তন করে গেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাহলে কীভাবে বাহাত্তরের সংবিধান মানি? এই অবস্থানের কারণে অনেকে বলার চেষ্টা করেন, আমরা সংবিধান মানি না। সংবিধান না মানলে এখানে এলাম কীভাবে? জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা আইন মান্যকারী নাগরিক। সংবিধান পছন্দ না হলে আন্দোলন করতে পারি, বিদ্রোহ নয়। খবর বিডিনিউজের।
জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রায় ৪৫ মিনিটের বক্তব্যে শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পরিবার, দেশের সার্বিক অবস্থা, তিস্তা প্রকল্প নির্মাণ, ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি প্রথম অধিবেশনকে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেন। স্পিকারকে জাতীয় সংসদের প্রাণসত্তা মন্তব্য করে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য অন্তস্থলের ধন্যবাদ জানান জামায়াতের আমির।
বিরোধীদলীয় নেতার আগে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেখানে তিনি উর্দু কবিতা পাঠ করেন, যা শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও উঠে আসে। তিনি বলেন, এখন তো সবাই ইংরেজি চর্চা করে। কিন্তু সংসদে এসে দেখি উর্দু হয়ে গেছি। সরকারি দলের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করছি। ট্রেজারি বেঞ্চের এমপিরা ইতিহাস চর্চায় ব্যস্ত। ক্ষমতায় যখন থাকেন, তখন নিজেকে সবাই ফেরেশতা মনে করেন। অন্যদের দোষ দেখেন। অন্যের দোষের তালিকা তৈরি করা খুব সহজ। ১২ মার্চ থেকে সরকারি দলের বক্তব্যের ৮০ ভাগ হচ্ছে ইতিহাস চর্চা।
শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সালকে আমি সম্মান করি। কারণ, সেই সময়েই এই সীমানা, ভূখণ্ড পেয়েছিলাম। ইতিহাস নিয়ে কোপাকুপির পর সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এসে বলেন, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো। ইতিহাস শিক্ষা ভালো। কিন্তু ইতিহাসকে নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা নিজেরা ইতিহাস তৈরি করতে পারব না। ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আসুন, আমরা এগিয়ে যাই। তিস্তা প্রসঙ্গ বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কারো চোখ রাঙানিতে ভয় পাই না। সরকার যদি সাহস করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করে, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত সমর্থন করবে। অন্তত আমি থাকবো। জামায়াতের পক্ষ থেকে বরাবরই তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের অর্থায়নের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। ভারতও এই প্রকল্পের কাজ পেতে চায়। বিরোধীদলীয় নেতার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিকমাধ্যমে ভুয়া ছবি দিয়ে তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রচারণার বিষয়টি তোলেন। পরে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যেও প্রসঙ্গটি আসে।
শফিকুর রহমান বলেন, আমি একটা কৈফিয়ত না দিয়ে পারছি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে জড়িয়ে যারা অশ্লীল আচরণ করেছে, উনি এখনও (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে ইশারা করে) বিচার চান নাই। আমি তার পক্ষে তাদের বিচার চাই। তখন টেবিলে চাপড়ে সমর্থন জানান বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। যোগ দেন সরকারি দলের সদস্যরাও। গালে হাত রেখে প্রধানমন্ত্রী তখন বক্তব্য শুনছিলেন।
শফিকুর রহমান যোগ করেন, উনার মেয়ে, আল্লাহ তায়ালা আমাকেও দুটি মেয়ে দান করেছেন, উনার মেয়ের সম্মান মানে আমার মেয়ের সম্মান, মানে আমাদের মেয়েরও সম্মান। এই ইতরপ্রাণীগুলো কারা, তাদেরকে নির্মোহভাবে খুঁজে বের করা হোক। প্রি কনসিভ (পূর্ব পরিকল্পিত) কোনো আইডিয়া থেকে নয়, ব্লেইম গেমের জায়গা থেকে নয়, ভেরি ট্রান্সপারেন্টলি (অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে) এটা বের করে আনা হোক।
শফিকুর রহমান বলেন, আমার নিজের দুঃখের কথা যেন নাইবা বললাম, একটা মানুষ হিসেবে বয়স হওয়ার পর থেকে গায়ে কাপড় রাখার চেষ্টা করেছি। মা, বাপ যেটুকু পেরেছেন, আমি যেটুকু এখন পারি সামথ্যের আলোকে। তো, আমার যে কতবার কাপড়চোপড় খুলে ফেলে। নিজেরটা আমি কারে বলবো। কী শিখাচ্ছি, কাদেরকে প্রশ্রয় দিচ্ছি। মনে রাখবেন, আমাদের কেউ যদি এদের প্রশ্রয় দেই, একদিন এরা আমাদের কাপড় নিয়ে টান দেবে।
এই নোংরা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এই নোংরা ধারা বন্ধ হওয়া উচিৎ। এই ধারা বন্ধের অস্ত্র সরকারের হাতে। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবো। সকল টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে, প্রথমত বলবো এই নোংরামি বন্ধের পথ বন্ধ করুন। ফিল্টার করে আউট করেন। ঘটনাচক্রে কিছু হয়ে গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। আমরা বিশ কোটি মানুষের নিরাপত্তা চাই। বলেন শফিকুর রহমান।
শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অভিবাদন জানান।














