মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হয়ে জামায়াতে ইসলামী করা যায় না মন্তব্য করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন কিশোরগঞ্জ–৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।
গতকাল মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে ফজলুর রহমানের এই বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন। এক পর্যায়ে স্পিকারও দাঁড়িয়ে সদস্যদের বসতে বলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে, লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সবাই আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্য। খবর বিডিনিউজের।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান, জামায়াতে ইসলামী, আল বদর, পুলিশ হত্যা, থানা লুট ও অস্ত্র লুটের প্রসঙ্গ তোলেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে নিজের মিশ্র ধারণা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও বিস্তারিতভাবে আসা উচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর ইতিহাস।
৫ আগস্টের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ওই আন্দোলনকে তিনি ছোট করে দেখেন না। তবে ৫ আগস্টকে বিপ্লব বলতে তিনি রাজি নন। আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, আগস্ট হল গণ অভ্যুত্থান। সেই গণ অভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তুলনা করতে চায়, জুলাই যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ, তাদেরকে আমি বলব, সবাইকে আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনাকে তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা এবং হিমালয় পর্বতের সঙ্গে টিলার তুলনা করার মতো বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যখন এক মাসের গণ আন্দোলনকে তুলনা করা হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয়।
বক্তব্যে তিনি পাল বংশ, সেন শাসন, মোগল শাসন, পলাশীর যুদ্ধ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ক্ষুদিরাম, চিত্তরঞ্জন দাস, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সুভাষচন্দ্র বসু, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিনে হয়নি। তার ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধ এত সহজ জিনিস না।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কথাও তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, একটা গান হইতে পারে নাই, একটা নাটক হইতে পারে নাই, একটা লালনের গীতি হইতে পারে নাই, একটা বাউল গান হইতে পারে নাই। সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
এরপর জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে প্রচার করা হচ্ছিল। আমি হতভাগা ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি মেজরিটি পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। এই কথাটা বলেছি, কথা সত্য। আমি বলে যাচ্ছি এবং তারা কোনোদিন যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। কারণ তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। তিনি বলেন, যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে। রাজাকার কোনোদিন এদেশে জয় লাভ করতে পারবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলে গেলাম।
এরপর বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানকে ইঙ্গিত করে ফজলুর রহমান বলেন, তিনি তাকে অসম্মান করেন না এবং সবসময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলেন। অথচ বিরোধী দলের নেতার দলের লোকজন তাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে।
এ সময় স্পিকার বলেন, আপনাকে কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? আপনার সম্বন্ধে এ রকম তো সংসদে কেউ বলে নাই। ফজলুর রহমান বলেন, করেছে, করেছে, আছে এখানে। পরে তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন।
স্পিকার বলেন, মাননীয় সদস্যবৃন্দ উনাকে বলতে দেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ অর্ডার অর্ডার। আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। এর মধ্যে ফজলুর রহমান আবার বলেন, আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।
বিরোধী দলের সদস্যরা আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে স্পিকার ফজলুর রহমানকে অপেক্ষা করতে বলেন। ফজলুর রহমান তখন বলেন, আমি কিন্তু উনাদেরকে খারাপ কিছু বলি নাই।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। ফজলুর রহমানকেও বসতে বলে স্পিকার বলেন, মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান, আপনি বসেন। আপনাকে সুযোগ দেওয়া হবে বক্তব্য শেষ করার জন্য। কার্যপ্রণালী বিধি মেনে সংসদ চালানোর ওপর জোর দিয়ে স্পিকার বলেন, আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অফ প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। কোনো বক্তব্যে আপত্তি থাকলে পরে যুক্তি খণ্ডনের পরামর্শ দেন স্পিকার। স্পিকার দাঁড়ালে সদস্যদের বসে পড়া উচিত বলেও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। যদি চেয়ারের প্রতি এই সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামী দিনে।
এরপর ফজলুর রহমানকে তিন মিনিটে বক্তব্য শেষ করতে বলেন স্পিকার। আবার বক্তব্যে ফিরে ফজলুর রহমান ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সনের ১৪ই ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে বলা হয় আল বদর। এবং সেই আল বদর বাহিনী কার ছিল আপনারা জানেন।
চলতি সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নাম শোক প্রস্তাবে রাখায় নিজের আপত্তির কথাও তুলে ধরেন এই মুক্তিযোদ্ধা। ফজলুর রহমান বলেন, আমি একা হইলেও এটা প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার। ৫ আগস্টের পর পুলিশের উপর হামলা, থানা লুট ও অস্ত্র লুটের ঘটনার তদন্ত দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ৫ই আগস্টের পরে যে ঘটনাগুলো হইছে, সেগুলো তো কোনো আইনে ইনডেমনিটি পাওয়ার কথা না। যদি ৫ই আগস্টের পরে কোনো পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, অস্ত্র নিয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত। ৫ আগস্টের আগে পুলিশের অন্যায় থাকলে তারও বিচার হওয়া উচিত।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ফজলুর রহমান বয়সে বড়, মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদানের কথা বলতে গিয়ে অন্যের অবদানের উপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কারও নেই।
শফিকুর বলেন, তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। তাহলে ইনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর, উনি বলেছেন কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। বক্তব্যের ওই অংশকে ‘অসংসদীয়’ আখ্যা দিয়ে তা এঙপাঞ্জ করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ করেছেন উনি। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন। এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন।
পরে স্পিকার বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যে অসংসদীয় কিছু থাকলে তা এঙপাঞ্জ করা হবে। একইভাবে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যেও অসংসদীয় কিছু থাকলে তা এঙপাঞ্জ করা হবে।














