নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায় তিন সংস্থার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি মেগা প্রকল্পসহ তিনটি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের পথে। এরপরও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলেনি নগরবাসীর। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে শহর। এদিন পূর্বে জলাবদ্ধতা হয়নি এমন অনেক এলাকায়ও গতকাল জলাবদ্ধতা হয়েছে। নগরের অনেক উঁচু এলাকায়ও জলজট হয়েছে। এছাড়া হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় শহরের অনেক এলাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি। পানি ঢুকে যায় বাসা–বাড়ি ও দোকানপাটে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগ হয়েছে নগরবাসীর। পথচারীদের ভোগান্তি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কারণ জলাবদ্ধতার জন্য গণপরিবহন ও অন্যান্য মোটরযানের সংখ্যা সড়কে কম চলে। ফলে কোমর সমান পানিতে হেঁটেই গন্তব্যে যেতে হয় পথচারীদের। এছাড়া অনেক জায়গায় পানিতে আটকা পড়ে যানবাহন। এতে সড়ক থেকে ফ্লাইওভারে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এর আগে গত সোমবারও হালকা বৃষ্টিতে নগরের কয়েক জায়গায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। গতকাল তা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ গত দুদিন ধরে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরও সুফল নেই কেন? নগরবাসী বলছেন, সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে তাদের মুক্তি মিলছে না। অনেকে আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছর (২০২৫) জলাবদ্ধতা কম হয়েছে জানিয়ে এবার ঋতুচক্রে বর্ষা আসার আগেই জলাবদ্ধতা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভারী বৃষ্টিপাত : গতকাল সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল। বেলা ১১টার পর পুরো আকাশ ঢেকে যায় ঘন কালো মেঘে। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। দুপুর ১২টার পর বাড়ে বৃষ্টির তীব্রতা, যা স্থায়ী ছিল প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নগরের আমবাগান আবহাওয়া অফিস ৯১ মিলিমিটার ও পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে।
এর আগে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে সেটাকে ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে গণ্য করা হয়। ওই হিসেবে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের রেকর্ডকৃত বৃষ্টিপাত অনুযায়ী গতকাল ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে নগরে।
সীমাহীন দুর্ভোগ : সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, মোহাম্মদপুর, রহমতগঞ্জ, নাসিরাবাদ আলফালাহ গলি, কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, জামালখান, জামালখানের লিচু বাগান ও প্রচ্ছদ গলি, সিরাজউদ্দৌলা রোডের সাবএরিয়া জয়নাব কলোনি, হালিশহর, আগ্রাবাদ, রেয়াজউদ্দিন বাজার ও তিনপুলের মাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। এসব এলাকার কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় সড়ক।
এর মধ্যে ভয়াবহ অবস্থা প্রবর্তক মোড়ে। এখানে গোলপাহাড় থেকে প্রবর্তক মোড় হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক তলিয়ে যায়। এই অংশের বদনা শাহ (র.) মাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রায় বুক সমান পানি হয়েছে। এই পানির ভেতর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায় পথচারীদের। এ সময় হোসাইন নামে এক পথচারী আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেলে আমার বড় ভাই ভর্তি আছেন। তিনি খুব অসুস্থ। বুক সমান পানিতে চলার পথে ঝুঁকি থাকলেও উপায় নেই। ভাইকে দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছি।
এদিকে দুপুরে হাঁটুর বেশি পানি দেখা গেছে মুরাদপুর ও মোহাম্মদপুরে। আগের দিন অবশ্য মোহাম্মদপুরে জলাবদ্ধতা হয়নি। মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন দোকানপট ও বাসা–বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। মুরাদপুরে আরমান নামে এক পথচারী বলেন, পাসপোর্ট অফিস গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় তেমন পানি ছিল না। আসার সময় মনসুরাবাদ থেকে সিএনজি নিই। নিচে পানি থাকায় লালখান বাজার থেকে ফ্লাইওভারে ওঠে সিএনজি। কিন্তু একটু আসতে যানজটে আটকা পড়ি। এক ঘণ্টার বেশি ফ্লাইওভারে আটকে ছিলাম।
গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে মোহাম্মদপুর মাজার রোডে হাঁটুর উপর পানি ছিল। এ সময় বহদ্দারহাট–মুরাদপুর সড়কে পানি দেখা যায়নি। জানা গেছে, রাতেও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার পানি কমেনি। ওই এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন গত রাত ১১টায় আজাদীকে বলেন, বাসার সামনে কোমর সমান পানি। এই পানি মাড়িয়ে খানিক আগে বাসায় ঢুকলাম। অথচ হিজরা খালের কয়েকটি বাঁধ কেটে দিলে চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার মানুষ চরম এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পায়।
শহরে উঁচু এলাকাগুলোর একটি জামালখান। গতকাল দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে ডুবেছিল জামালখান সড়কটি। আগে কখনো এখানে জলাবদ্ধতা হয়নি বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল খোলা ছিল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছিল এসএসসি পরীক্ষা। জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ হয়েছে তাদের।
এদিকে জলাবদ্ধতার অজুহাতে মনগড়া ভাড়া আদায় করেছেন রিকশা ও সিএনজি টেঙিচালকরা। রিকশাচালকরা মুরাদপুর থেকে চকবাজার অলি খাঁ মোড় পর্যন্ত ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা দাবি করেছেন। কাতালগঞ্জের পানির জন্য এ সড়কের নিয়মিত পরিবহন ম্যাঙ্মিা চলেনি। তবে চকবাজার থেকে কোতোয়ালী পর্যন্ত চলেছে। এর মধ্যে চকবাজার থেকে চেরাগী পাহাড় পর্যন্ত নিয়মিত ভাড়া ১০ টাকা হলেও গতকাল বিকেলে ২০ টাকা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন আজিজ নামে এক যাত্রী।
কেন এই জলাবদ্ধতা : জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের আওতায় সংস্কার করা হচ্ছে হিজরা খাল। কাজের সুবিধার্থে এ খালের বিভিন্ন অংশে দেওয়া বাঁধের কারণে ডুবেছে প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকাসহ আশেপাশের এলাকা।
এছাড়া জামালখান খাল সংস্কার কাজের জন্য দেওয়া বাঁধের কারণে জামালখান, দিদার মার্কেট, সাবএরিয়া ও তিন পুলের মাথা এলাকায় পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। মুরাদপুর বঙ কালভার্ট নির্মাণকাজ চলমান থাকায় মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায়ও জলাবদ্ধতা হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় নালা ও আশেপাশের খাল ময়লা–আবর্জনায় ভরাট থাকায় হয়েছে জলাবদ্ধতা।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের আওতায় হিজরা ও জামালখন খালে রিটেইনিং ওয়ালের নির্মাণকাজ করছে। পাশাপাশি মুরাদপুরে কালভার্টের কাজ করছে। কাজ করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়েছে। এই বাঁধ দেওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন আজাদীকে বলেন, হিজরা খালে ২০টির মতো এবং জামালখান খালে ১০টি বাঁধ আছে। আসলে ১৫ মে’র মধ্যে কাজ শেষ করে বাঁধ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় সমস্যাটা হয়ে গেছে। আমরা সবগুলো বাঁধ কেটে দিয়েছি। এরপর পানি নেমে গেছে। আপাতত আর বাঁধ দেওয়া হবে না। শুধু পরিষ্কার করা হবে।
এদিকে খাল–নালা ভরাট থাকার জন্য অনেকে নগরবাসীর অসচেতনতাকেও দায়ী করেছেন। পরিষ্কার করার পরও মানুষ ময়লা–আর্বজনা ফেলায় খাল ভরাট হয় বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে আবু খান নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তিতা হলেও একটা সত্যি কথা বলি, এই যে আজকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামটা পানির নিচে ডুবে গেল, এর আংশিক দায় কিন্তু আমাদের চট্টগ্রামবাসীকে অবশ্যই নিতে হবে।’ তিনি রান্নাঘরের আবর্জনা পলিথিনে মুড়িয়ে ড্রেনে–খালে ফেলা, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের মালামাল ড্রেনে ফেলাকেও এজন্য দায়ী করেছেন।














