দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও বাঙালির প্রধান উৎসব নববর্ষের উৎসব। বাংলা নববর্ষ উদযাপনে বিদেশে আনন্দ উত্তেজনার কমতি নাই। আমাদের এই সিডনিতে এখন অজস্র বাংলাদেশীর বসবাস। তারা তাদের মন মনন আর চিন্তায় বাংলাকে ধারণ করে। ধারণ যে করে তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। অন্য সব প্রমাণের পাশাপাশি একটি বড় প্রমাণ বাংলা নববর্ষ। আমাদের এই শহরে বৈশাখি মেলারও কমতি নাই। গোড়ার দিকে বঙ্গবন্ধু পরিষদের নামে একাধিক মেলা হলেও কালক্রমে ব্যক্তি উদ্যোগেও বৈশাখি মেলা হতে দেখছি। এগুলো কতদিন টিকবে বা কতসময় পর্যন্ত চলবে সে ধারণা করা এখন ই মুশকিল। তবে একটা কথা হলফ করে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ থেকে বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের নামে যে মেলা তা তিরিশ বছর যখন টিকেছে আরো অনেক বছর টিকে থাকবে ।

তারা সিডনি অলিম্পিক পার্কের মতো নামকরা জায়গায় বাঙালিদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করার অনেক পথ আছে। রাজনীতি ছাড়া আর কোন পথ মাড়াতে রাজী নয় বাঙালি। কেন নয় তার উত্তর এই লেখায় দেব না। বহুধা বিভক্ত রাজনীতি থেকে দূরে থাকি। দূরে আছি। কিন্তু এটা মানতে হবে মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালির সাথে থাকার কারণে আমরা কোন আক্রোশ থেকেই মুক্ত থাকতে পারি না। থাক আক্রোশ, তারপর ও আমাদের জয়যাত্রা চলছে চলবে।

বিগত দেড় বছরে হঠাৎ করে রিসেট বাটন চাপার এক প্রতিনায়ক হাজির হয়েছিলেন। তিনি খুব দৃঢ়তার সাথে বলতেন এই বাটন বা বোতাম চিপে দিয়েছেন ফলে আর আমাদের অতীত বা ইতিহাসের দরকার পড়বে না। ভাই যার কাজ তারে সাজে বলে একটা কথা আছে। ভদ্রলোক সে কথা ভুলে গেছিলেন। কিন্তু বাঙালি কোন বোতাম বা বাটনে বিশ্বাস করে না। তাকে অমন হাজার বাটন দাবালেও সে তার পহেলা বৈশাখ ভুলবে না। ভুলবে যে না তার প্রমাণ তো এ বছর মিলেছে। মানুষ দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বের হয়ে মুক্ত বাতাসে আনন্দে শোভাযাত্রা করেছে। গান গেয়েছে। সবচেয়ে দামী কথাটি বললেন ডা: সারওয়ার আলী। ছায়ানটের অভিভাবক সারওয়ার ভাই বলেছেন আমরা এমন একটা সমাজ চাই যেখানে মানুষ ভয়হীনভাবে গান গাইতে পারবে। কতটা সংঘাতিক ভয়াবহ পরিস্থিতি হলে এমন কথা বলতে হয়। কেন এই ভাবনা?

বাংলাদেশের নারীরা কী আগের মতো আছেন? একাত্তরে যে দেশের জন্ম যে দেশের নারীরা খোলা চুলে কাঁধে বন্দুক নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিল আজ তাদের কী চেহারা? দেশের নারীকুলের মাথা দেখা যায় না আর। সেটা কি আসলে ধর্ম না কোন বিশ্বাস? না মরুর হাওয়া? এই হাওয়ায় তাদের কাঁধের এককালের মুক্তির বন্দুক আজ হয়ে গেছে জঙ্গির হাতিয়ার। চিরকাল জেনে আসা মায়ার দেশ মমতার সমাজে নারীরা ভবনের ভেতর থেকে আইনের সাথে যুদ্ধ করে। লড়াই করে এদেশের নিয়মিত বাহিনীর সাথে। কেন? তারা এই কাল ইহকাল বা আজকের কিছুতে বিশ্বাস করে না। তাদের মগজে মস্তিস্কে পরকাল। যার সাথে ধর্মের আসলে কোনো যোগ নাই। চিরকাল যে আলো আমাদের পথ দেখিয়েছে, যে ধর্ম আমাদের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী শুনিয়ে মহান করে তুলেছিল এরা তাকে বিতর্কিত করে ফেলছে। এরা এদেশের পানি হাওয়া কিংবা সংস্কৃতি কিছুতেই তাদের বিশ্বাস নাই। নাই বলেই এরা আমাদের জাতীয় পতাকা গান ভাষ্কর্য সবকিছু ভেঙেঙ তছনছ করে দিতে চায়। যদি তাই হয় বা হতে থাকে তাহলে কিভাবে পহেলা বৈশাখ নিরাপদ থাকবে দেশে?

পুরুষদের অন্তর আর বাইরে চলছে নিত্য দ্বন্দ্বের এক আশ্চর্য খেলা। তারা ভেতরে ভোগী বাইরে সুশীল। সামাজিক মাধ্যমের কিটরা খুব ভালো ভাবে জানে তারা এখানে কী করে? আজ দেশে যে পুরুষতন্ত্র দাপটের সাথে ঘুরে বেড়ায় সমাজ শাসন করে তাদের ভেতর বাঙালিয়ানা নেই বললেই চলে। হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়ানো এদের সাথে বাঙালিয়ানার সম্পর্ক এখন শূন্যের কোটায়। চারিত্রিক বিশৃঙ্খলা বহুগামিতা আর বান্ধবীর নামে পরকীয়ার সমাজে একদিন সকালে নতুন পাঞ্জাবি বা পোশাক পরে ঘুরলেই বাঙালি হওয়া যায় না। তাও একবেলার জন্য। সকালের রোদ তেতে উঠতেই আমাদের আরেক চেহারা। সন্ধ্যা গড়াতে পানাহারে মত্ত আরেক বাঙালি জাতি আমরা। এই জাতি কি করে পহেলা বৈশাখের পতাকা বহন করবে? আমরা যারা দেশের বাইরে নিরাপদ ভূমিতে থাকি আমাদের দায়িত্ব বেশি। এই সিডনি শহরে এখন অনেকগুলো মেলা হয়। হোক হতে থাকুক। কিন্তু এমন যে মেলাটি যাতে আমরা দেশের পাশাপাশি বিদেশের আন্তর্জাতিক আবহ দেখতে পাই তাকে বেগবান করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের সমাজে রাজনীতি বড় জটিল। সে জটিলতার বাইরে পা রেখে বৈশাখি মেলাকে যারা বড় করে তোলেন তাদের সঙ্গ দেয়া হোক আমাদের কাজ। আমরা যেন ভুলে না যাই এরা বড় হলে আমরাও বড় হবো। যে কোন দিবসে আমরা প্রবাসীদের বিশাল ভূমিকা দেখি। তারা দাঁড়ায় বলেই অনেক কিছু সম্ভব হয়। আবার অসম্ভব করে দেয়া যায় অনেক কুকাজ। সে দিক থেকে আমার ধারণা বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের বৈশাখি মেলাটি পারবে প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়াতে। আমি তাদের উদারতা কামনা করি। সাথে এটাও মনে করি সিডনি প্রবাসী বাংলাদেশী এবং বাঙালিরা যেন এর সাথে থেকে বড় কাজের পথ প্রশস্ত করে দেন।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়। নিজেকে জয় করার সময় এখন দুয়ারে। অপ রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা বঙ্গবন্ধু বিরোধিতা আর ইতিহাস তছনছ করার হাত থেকে দেশ ও মানুষকে বাঁচাতে হলে ঐক্যবদ্ধ হবার বিকল্প নাই। সে ঐক্যের সূতিকাগার বৈশাখি মেলা বা নববর্ষ উদযাপন। সবার যোগে জয় হোক বাঙালির এই উৎসব।

লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, কবি ও সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজ্ঞান- সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের এক প্রাণবন্ত সাহিত্য উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধমহানগর সিটিজেন ফোরাম সদরঘাট থানার খাবার বিতরণ