ঐতিহাসিক জব্বারের বলীখেলার আজ ১১৭তম আসর। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় বলীখেলার জনপ্রিয় এ আসর। বলীখেলার মূল আয়োজন শুরু হবে আজ শনিবার বিকাল ৩টায়। ইতিমধ্যে বলীখেলার মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বলীখেলা পরিচালনাসহ সবকিছুর কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
বলীখেলা উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। বলীখেলা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ী বলীদের হাতে ক্রেস্ট ও প্রাইজমানি তুলে দেবেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এতে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং স্পন্সর প্রতিষ্ঠান বাংলালিংকের কর্মকর্তা সাঈদ হোসেন চৌধুরী। বলীখেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমান গত রাতে জানান, প্রায় ১২০ জন বলী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ আগের রাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিযোগিতাস্থলে এসেছেন। আবার কেউ কেউ আজ সকালে এসে উপস্থিত হবেন।
বলীখেলাকে কেন্দ্র করে দেশের সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলা গতকাল থেকে লালদিঘির আবদুল জব্বার চত্বরে শুরু হয়েছে। তবে আগের দিন বৃহস্পতিবার থেকে বিভিন্ন নিত্যপণ্য নিয়ে বসে গেছে হাজারো দোকানপাট। শুরু হয়েছে বেচাকেনাও। হাজার হাজার উৎসাহী মানুষ আসছেন লালদিঘির নতুন ঘোষিত আবদুল জব্বার চত্বরে। এবার বলীখেলার স্পন্সর করছে মোবাইল অপারেটর কোম্পানি বাংলালিংক।
আয়োজক কমিটির সদস্য আলী হাসান রাজু জানান, শতাধিক প্রতিযোগী জব্বারের বলীখেলায় অংশ নেবেন। গতবারের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ বলী গতরাতে চলে আসবেন বলে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। গতবার সেমিফাইনালে উঠেছিলেন বাঘা শরীফ বলী, কামাল বলী, রাশেদ বলী ও শাহজাহান বলী। এদের মধ্যে ফাইনাল খেলেছিলেন বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আবদুল জব্বার সওদাগরের নাতি শওকত আনোয়ার বাদল জানান, এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক বলী অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
কুমিল্লা, কঙবাজার, সীতাকুণ্ড, রাঙামাটিসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে বলীরা আসবেন। আয়োজক কমিটি জানায়, ৮ জন সেরা বলী নিয়ে প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বলীখেলা উপলক্ষে লালদীঘির চারপাশে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় বসেছে দুদিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। দেশের দূর–দূরান্ত থেকে আগত দোকানিরা বসেছেন নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে। এসএসসি পরীক্ষা চলার কারণে ২৬ এপ্রিল ভোরে মেলা শেষ করে দিতে হবে। মেলা উপলক্ষ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপনসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, খুলনা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনা থেকে শুরু করে ফুলদানি ও পুতুল, বেত, কাঠ ও বাঁশের তৈরি নানা আসবাবপত্র, হাতপাখা, মাছ ধরার পলো, ডালা, কুলো, গাছের চারা, মুড়ি–মুড়কি, শীতল পাটি, দা–বঁটি, ছুরিসহ গৃহস্থালীর সব ধরনের সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে।
মেলার প্রথম দিন গতকাল লালদীঘি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আন্দরকিল্লা থেকে কোতোয়ালী মোড়, জেল রোড, কেসি দে রোডসহ আশপারেুর সড়ক ও ফুটপাতে দোকানিরা তাদের পণ্য নিয়ে বসেছেন। কেউ কেউ দোকান সাজাচ্ছেন, কেউ বিক্রির জন্য আনা মৃৎশিল্পের নানা পণ্যে রং করছেন। মাটির তৈজসপত্র, ঝাড়ু, হাতপাখা, শীতলপাটি, দা–খুন্তি, প্লাস্টিকের সামগ্রী, ফুল, মণ্ডা–মিঠাই, গৃহসজ্জার সামগ্রী, গাছের চারা, তামা–কাঁসা–পিতলের সামগ্রী, কাঠের আসবাবপত্র, বেতের আসবাব, বাদ্যযন্ত্র, দোলনা, মাছ ধরার জাল, মোড়া, পিঁড়ি, জলচৌকিসহ সবকিছু আছে এই মেলায়। নগরবাসী সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন মেলার জন্য। কারণ এখানেই মিলে গৃহস্থালীর সব জিনিসপত্র। দোকানিরা জানান, দুদিনব্যাপী মেলা হলেও তারা প্রতি বছর মেলার দুই দিন আগে থেকেই দোকান সাজাতে শুরু করেন।
ঢাকা থেকে মেলায় মাটির তৈজসপত্র নিয়ে আসা ব্যবসায়ী আতিক বলেন, দুইদিন আগেই মেলায় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি। ট্রাক ভাড়া বেশি দিতে হয়েছে। মেলায় মানুষ বাড়লে বিক্রি হবে বলে আশা করছি।
কুমিল্লা থেকে মণ্ডা–মিঠাই নিয়ে আসা জাহাঙ্গীর বলেন, আমাদের পরিবারের সবাই এই ব্যবসায় জড়িত। দেশের যেখানে মেলা হয় আমরা সেখানে দোকান দিই। বাপ–দাদার আমল থেকে জব্বারের বলীখেলায় প্রতিবছর আসি। দোকান সাজাচ্ছি। আশা করি বেচাবিক্রি ভালো হবে।
কাপ্তাই থেকে পাহাড়ের ফুলের ঝাড়ু নিয়ে আসা অথৈ মারমা বলেন, প্রতিবছর এই মেলায় ফুলের ঝাড়ু নিয়ে আসি। এবারও সাড়ে পাঁচশ জোড়া ঝাড়ু এনেছি। চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দারা এই মেলা থেকে ঝাড়ু কেনার জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন। জব্বারের বলীখেলা থেকে কেনা হাতপাখার কদর চট্টগ্রামজুড়ে।
চন্দনাইশ থেকে বেত ও তালপাতার পাখা এনেছেন জহির মিয়া। গরমের এই সময়ে হাতপাখা কিনে কেউ ঠকবে না বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। দূর–দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চোখে এখন ভালো বেচাকেনার স্বপ্ন। বিভিন্ন এলাকা থেকে মেলায় আসা ক্রেতারা জানান, তারা প্রতিবছর এই মেলার জন্য অপেক্ষা করেন। ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার চেষ্টা করেন তারা এই মেলা থেকেই। জমজমাট বেচাকেনা চলছে বলেও জানান তারা।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুব সমাজকে সংগঠিত করতে ১৯০৯ সালে বদরপাতি এলাকার আব্দুল জব্বার সওদাগর নগরীর লালদীঘি মাঠে আয়োজন করেন কুস্তি প্রতিযোগিতা, যা সময়ের পরিক্রমায় জব্বারের বলীখেলা নামে সুপরিচিত হয়। প্রতিবছর বৈশাখের ১২ তারিখে লালদীঘির ময়দানে বলীখেলা হয়।














