মামলার তদন্তে ৩ বছর পার, বিচারের আশায় পরিবার

আইনজীবী মামুন হত্যা

হাবীবুর রহমান | মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম আদালতের শিক্ষানবিশ আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন খুনের ৩ বছর পার হয়েছে। কিন্তু ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত এখনও শেষ করা যায়নি। তদন্ত কার্যক্রম কবে শেষ হবে, কবে বিচার শুরু হবে, কবে বিচার শেষ হবেএ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে মামুনের পরিবারে। দীর্ঘ ১৪ মাস তদন্তের পর পিবিআইয়ের দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদীর আপত্তির মুখে ২১ মাস আগে সিআইডিকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও সংস্থাটি বলছে, মামুন হত্যা মামলার তদন্ত এখনো চলমান। প্রতিবেদন দাখিল করতে আরও বেশ সময় লাগবে।

২০২৩ সালের ১৯ এপ্রিল রাতে নগরীর ডিসি রোডের মিয়ার বাপের মসজিদ এলাকার ভাড়া বাসায় শিক্ষানবীশ আইনজীবী মামুনের রহস্যময় মৃত্যু ঘটে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। অণ্ডকোষ থেতলানো পাওয়া যায়। তিনি চকরিয়ার উত্তর লক্ষ্যারচর এলাকার মো. জামাল উদ্দিনের ছেলে। মামুনের এমন মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই মো. ইসকান্দার মির্জা বাদী হয়ে নগরীর চকবাজার থানায় মামুনের স্ত্রী লিজার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২২ সালের শুরুর দিকে প্রেম করে বিয়ে করেন মামুন ও লিজা। নগরীর ডিসি রোডের মিয়ার বাপের মসজিদ এলাকার রফিক সওদাগরের বিল্ডিংয়ের ৬ তলায় তারা বসবাস শুরু করেন। পরে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এজাহারে মো. ইসকান্দার মির্জা লিখেন, রাতে লিজা ফোন দিয়ে জানায়, মামুন অজ্ঞান হয়ে গেছে। অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। কী হয়েছে তা জানতে চাইলে একেক সময় একেক কথা বলে। একপর্যায়ে মামুনকে পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যায় লিজা। কিন্তু এর মধ্যে মামুন মৃত্যুবরণ করায় ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তিনি সেখানে গিয়ে মামুনের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। একপর্যায়ে সেখান থেকে মামুনের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আদালতসূত্র জানায়, শুরুতে মামুন হত্যা মামলার তদন্ত পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই খুনের আলামত পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে সংস্থাটির পক্ষ থেকে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে বলা হয়, মামুন আত্মহত্যা করেছেন।

আদালতসূত্র আরো জানায়, পিবিআইয়ের উক্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তখন বাদী একটি নারাজি পিটিশন দায়ের করেন। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলাম মামলাটি পুনঃতদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে বাদীর আইনজীবী নওশেদ আলী আজাদীকে বলেন, মামুন খুনের মামলায় তদন্ত সংস্থা পিবিআই আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট না দিয়ে প্রভাবিত হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ভিকটিম মামুন আত্মহত্যা করেছেন। অথচ সুরতহাল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামুনের শরীরের মাথা, পিঠসহ অসংখ্য স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান তদন্তকারী সংস্থার উপরও আস্থা পাচ্ছি না। মনে হচ্ছেপিবিআইয়ের মতো একই রকমের একটি প্রতিবেদন জমা দেবে সংস্থাটি। তা না হলে এতো তালবাহানা কেন? আর কতসময় নেবে তদন্ত শেষ করতে? আইনজীবী নওশেদ বলেন, পিবিআইয়ের মতো একই রকমের রিপোর্ট দাখিল করা হলে আমরা তা মানব না। আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ফের পরীক্ষা করার আবেদন করব।

বাদীর আরেক আইনজীবী নাছির আলী আজাদীকে বলেন, সর্বশেষ গত ১৪ এপ্রিল মামলার ধার্য তারিখ ছিল। সেদিন আদালতের কাছে আমরা একটি পিটিশন সাবমিট করি। তাতে দ্রুত যাতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয় সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে তাগাদা দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলাম। এরই প্রেক্ষিতে আদালত থেকে তদন্ত কর্মকর্তাকে তাগাদাও দেওয়া হয়। পরদিন বাদীকে সিআইডি অফিসে ডাকা হয় জানিয়ে আইনজীবী নাছির আলী বলেন, আমরা চাইছি যে, দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হোক।

মামুন হত্যা মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন গতকাল আজাদীকে বলেন, মামুন হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ হতে আরো বেশ সময় লাগবে। শেষ করেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

আদালতসূত্র জানায়, মামুনের মৃত্যুর পরপরই পুলিশ তার স্ত্রী লিজাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দীর্ঘ ১৮ মাস পর ২০২৪ সালের শেষের দিকে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশতাধিক মরা গাছ সরাচ্ছে না কেউ, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল
পরবর্তী নিবন্ধস্কুলছাত্রকে অপহরণ, আসামি গ্রেপ্তার