সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার জন্য, যিনি পৃথিবীতে মানব জাতির হিদায়তের জন্য অসংখ্য নবি রাসূল আলাইহিমুস সালাম প্রেরণ করে বিভ্রান্তির অমানিশা থেকে মুক্ত করে জাতিকে মুক্তির দিশা দিয়েছেন। নবী রাসূলগণ আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব পরিপূর্ণ ভাবে পালন করে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি একক অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মানবতার কান্ডারী মুক্তির দিশারী শাফাআতের সুমহান মর্যাদার অধিকারী সৈয়্যদুল মুরসালীন খাতামুন নবীয়্যিন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। তাঁর উপর অসংখ্য দরুদ–সালাম বর্ষিত হোক। তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, তাঁর পদাঙ্ক অনুসারী সত্যান্বেষী মু’মিন নর–নারীর উপর অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম’র জীবনাদর্শ অনুসরণ করুন। তাঁদের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা নিবেদনকে মু’মিন হিসেবে অপরিহার্য মনে করুন। নবী রাসূলগণের প্রতি অবজ্ঞা অশ্রদ্ধা ও তাঁদের সুমহান মর্যাদা ও শানের বিপরীত কিঞ্চিত অবমাননা করাকে কুফরী মনে করুন। ধরাধামে আল্লাহর প্রেরিত ও মনোনীত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামদের মধ্যে হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম অন্যতম। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে দুনিয়ার বাদশাহী ও নবুওয়াতের মহান নিয়ামত দানে সম্মানিত করেছেন।
হযরত দাউদ (আ.)’র পরিচিতি ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত: হযরত দাউদ (আ.) খ্রিস্টপূর্ব ১০ম শতাব্দীতে জেরুসালেমে জন্ম গ্রহণ করেন, তিনি একাধারে একজন বাদশাহ ও একজন রাসূল ছিলেন। পূর্বে বনী ইসরাইলের এক বংশের কাছে ছিল শাষণ ক্ষমতা ও রাজত্ব। অন্য বংশের কাছে ছিল নবুওয়ত। আল্লাহ তা’আলা দাউদ (আ) কে রাজত্ব ও নবুওয়ত দুটোই দান করে মহিমান্বিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে ১৬ জায়গায় তাঁর নাম মুবারক উল্লেখ রয়েছে। তাঁর উপর আসমানী কিতাব যাবুর নাযিল হয়েছে। তিনি যাবুর কিতাব অতিদ্রুত সুমধুর কন্ঠে তিলাওয়াত ও আবৃত্তি করতে পারতেন। নবীগণের মধ্যে তিনি সেরা সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরের অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম “ঈশা” মহান আল্লাহ তাঁকে অসংখ্য মু’জিযা দান করেছেন, তাঁর নুরানী হাতের পরশে শক্ত লৌহ বর্ম ও পাথর নরম হয়ে যেত। তাঁর আমলে ইসরাইলের শাসক ছিলেন তালুত। হযরত দাউদ (আ) বাদশাহ তালুতের কন্যাকে বিবাহ করেন, লৌহ বর্ম প্রস্তুত ও নির্মাণে তাঁর সুনিপুণ ও অসাধারণ দক্ষতা ছিল। আল্লাহর নবী জ্বীন ইনসানের বাদশাহ হযরত সুলায়মান (আ) ছিলেন তাঁর সন্তান। হযরত দাউদ (আ) একশত বৎসর হায়াত লাভ করেন।
আল কুরআনের আলোকে হযরত দাউদ (আ)’র রাজত্ব ও প্রজ্ঞা: রাষ্ট্রীয়ভাবে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতার প্রয়োজন, মহান আল্লাহ জমিনে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবী রাসূলদের প্রেরণ করেছেন, হযরত দাউদ (আ) রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুবিচার আইনের শাষণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অন্যায় অবিচার যুলম নির্যাতন প্রতিরোধে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি অন্যায় অবিচার, যুলম–নির্যাতন, প্রতিরোধে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক তাঁর উপর অপির্ত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সফলতার সাথে পালন করেছেন। আল্লাহ তা’আলা হযরত দাউদ (আ) কে সম্বোধন করে এরশাদ করেছেন, “(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ আমি আপনাকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়েছি, কাজেই আপনি জনগনের মধ্যে সত্যসহ শাষণ করুন। আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তাহলে সে আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথে নিয়ে যাবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথে চলে যায় তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে, কারণ তারা হিসাব নিকাশের দিনটিকে ভূলে গেছে। (সূরা: সোয়াদ, ২৬)
আল্লাহ তা’আলা আরো এরশাদ করেছেন, আমি তাঁর রাজত্বকে সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম তাকে “হিকমত” ও ফায়সালাকারী কথা বলার যোগ্যতা দিয়েছিলাম। (সূরা: সোয়াদ, ২০)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকার হাকীমুল উম্মত “মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (র.)” প্রণীত তাফসীরে “নূরুল ইরফান” এ উল্লেখ হয়েছে, হযরত দাউদ (আ)’র সালতানাত রাজত্ব এমনভাবে সুদৃঢ় করা হয়েছে তেমনি আর কারো হয়নি, চল্লিশ হাজার বর্ম সজ্জিত সিপাহী তাঁর রাজ প্রাসাদকে পাহারা দিত, আয়াতে বর্ণিত “হিকমত” দ্বারা “ফিকহ” শরয়ী প্রজ্ঞা এবং ক্বাউল–ই ফায়সালা দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা বিচার কার্য কর্ম পদ্ধতি ও পরিচালনার জ্ঞান বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, পারা–২৩, পৃ: ১২১৪)
আল্লাহ পাহাড় পর্বত, পক্ষীকুল ও লৌহকে দাউদ (আ)’র জন্য অনুগত করে দেন: আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তাঁর সকল সৃষ্টিকে তাঁর প্রিয় বান্দা নবী রাসূলের অনুগত করে দেন। দাউদ (আ)’র রাষ্ট্র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ এর সমুজ্জ্বল প্রমাণ। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “এবং নিশ্চয় আমি দাউদ কে স্বীয় মহা অনুগ্রহ দান করেছি। (আমি হুকুম দিলাম) হে পর্বতমালা! তার সাথে আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন করো এবং হে পক্ষীকুল! এবং আমি তার জন্য লোহাকে নরম করেছি যাতে প্রশস্ত বর্ম তৈরী করো এবং তৈরী করার মধ্যে পরিমাপ রক্ষা করো, আর তোমরা সবাই সৎকর্ম করো নিশ্চয় আমি তোমাদের কর্ম দেখছি। (সূরা, সাবা: ১০–১১)
বর্ণিত আয়াত সমূহের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকার হাকিমুল উম্মত “মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (র)” বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা’আলা দাউদ (আ) কে নবুওয়ত ও বাদশাহী দান করেছেন, এমন সব বৈশিষ্ট্যাবলী তাঁকে দান করেছেন যা আয়াতে উল্লেখ হয়েছে, তা হলো হযরত দাউদ (আ) যখন তাসবীহ ও তাহলীল সুবহানাল্লাহ ও লাইলাহা ইল্লাল্লাহ আবৃত্তি করতেন তখন সমস্ত পর্বতমালা ও পক্ষীকুল তাঁর সাথে এমন ভাবে তাসবীহ পাঠ করতো যা শুনা যেতো, অন্যথায় সৃষ্টি রাজির সবকিছুই তো আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে থাকে। বর্ণিত তাফসীরে আরো উল্লেখ রয়েছে, তাঁর নুরানী হাতে লৌহ বর্ম মোম কিংবা আটার খমীরের মতো নরম হয়ে যেতো, যখন তিনি যা ইচ্ছা করতেন গরম করা বা পেটানো ছাড়াই তা তৈরী করতে পারতেন।
দাউদ (আ) লৌহ বর্ম তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতেন: একদা একজন ফিরিস্তা দাউদ (আ)’র দরবারে এসে আরয করেছিলেন, আপনি খুব ভালো, আপনি যদি “বায়তুল মাল” রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিজ জীবিকা গ্রহণ না করতেন? তখন তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন হে আল্লাহ! আমাকে অদৃশ্য থেকে জীবিকার সামগ্রী উপকরণ দান করুন, আমি যাতে রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল থেকে কিছুই গ্রহণ না করি, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এ মু’জিযা দান করেন, খোদা প্রদত্ত মু’জিযা লাভ করে লৌহ বর্ম তৈরী করে বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, জাগতিক শিক্ষক ছাড়া স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে এ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, পারা: ২২, পৃ: ১১৪৬)
হাদীস শরীফের আলোকে দাউদ (আ)’র বৈশিষ্ট্যাবলী: হযরত দাউদ (আ) নিজ হাতে জীবিকা উপার্জন করতেন, তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো প্রকার ভাতা নিতেন না। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পরিশ্রমের উপার্জনের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে হযরত দাউদ (আ)’র দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “সাহাবী হযরত আবু মুসা আশআরি”(রা.)’র তিলাওয়াতকে পছন্দ করতেন তিনি সাহাবী আবু মুসা আশআরি (রা.)’র প্রশংসায় বলতেন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে দাউদী কণ্ঠ দান করেছেন। (সুনানে তিরমিযী)
স্বহস্তে উপার্জন করা নবী রাসূলগণের সুন্নাত। ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। স্বহস্তে উপার্জন মানুষকে স্বাবলম্বী করে, আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। হাদীসে এরশাদ হয়েছে, হযরত রাফে ইবনে খাদীজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি? নবীজি বললেন, স্বহস্তের উপার্জন ও সততার ভিত্তিতে ক্রয় বিক্রয়। (মুসনাদে আহমদ, খন্ড:৪, পৃ: ১৪১)
হে আল্লাহ! আমাদেরকে সম্মানিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম’র জীবনাদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী); খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
মুহাম্মদ নূরুল কবির
বাহুলী, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: কাযা নামাযের বিধান সম্পর্কে জানালে উপকৃত হব।
উত্তর: নামাযের সময় অতীত হয়ে যাওয়ার পর পড়াকে কাযা বলে। যথা সময়ে পালন করাকে আদায় বলা হয়। নিদ্রার কারণে বা ভুলক্রমে নামায কাযা হয়ে গেলে তখন কাযা পড়ার ফরজ অবশ্য কাযা হওয়াতে তার উপর গুনাহ হবেনা। কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় বা স্মরণে আসার পর কাযার গুনাহ হবে। মাকরুহ সময় না হলে ঐ সময়েই পড়ে নিবে, বিলম্ব করা মাকরূহ। ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর নিদ্রা গেল সময় চলে গেল তখন অবশ্যই গুনাহগার হবে। সূর্যোদয় সূর্যাস্ত ও দ্বিপ্রহরের সময় কাযা নামায পড়া জায়েজ নেই। (আলমগীরি, বাহারে, শরীয়ত ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৬২)
ফরজের কাযা ফরজ, ওয়াজিবের কাযা ওয়াজিব, সুন্নাতের কাযা সুন্নাত, অর্থাৎ ওসব সুন্নাত যেগুলোর কাযা রয়েছে যেমন ফজরের সুন্নাত যখন ফরজও বাদ পড়ে যায় এবং জোহরের পূর্বের সুন্নাত যখন জোহরের সময় বাকী থাকে। (দুরুল মোখতার, রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৬২)














