স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে যথাযথ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন

| শুক্রবার , ১০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্যের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষ এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে, যা ২০৩০ সালে ১৮২২ শতাংশ নামিয়ে আনা সম্ভব বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এছাড়া পাকিস্তানের ৫১, নেপালের ৫৯, মালদ্বীপ ও ভুটানের ৬৫ শতাংশ মানুষ এ সেবা পাচ্ছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় রয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সিঙ্গাপুরের ৮৬ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা পায়। এছাড়া থাইল্যান্ড ৮৩, ভিয়েতনাম ৭৩, ইন্দোনেশিয়া ৭১, মালয়েশিয়া ৭৭ এবং মিয়ানমারের ৬৪ শতাংশ মানুষ এ সেবার আওতায় এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব দেশের মানুষ ৭৫৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দেশের সব মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

এদিকে, ৭ এপ্রিল দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত এখনো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। চট্টগ্রামে নেই কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল। ফলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের জেলা উপজেলার প্রায় ৪ কোটি মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। চমেক হাসপাতালের মোট শয্যা ২ হাজার ২০০ তে উন্নীত করা হলেও সেই তুলনায় জনবলসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়েনি। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থান সংকুলানের অভাবে অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তাই মেঝেতে বসে চিকিৎসকদের চিকিৎসা দিতেও হিমশিম খেতে হয়। চমেক হাসপাতালের বাইরে নগরীতে সরকারি পর্যায়ে রয়েছে ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস) হাসপাতাল। জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, বিভাগ ও যন্ত্রপাতির সংকট। তাই হাসপাতালের চিকিৎসা বেশিরভাগই বহির্বিভাগ কেন্দ্রিক। আবার বিআইটিআইডি হাসপাতালে চট্টগ্রাম শহরের বাইরে হওয়ায় অনেক রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে যান না। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতের সুযোগ সুবিধা না বাড়ায় প্রায় রোগী ঢাকার দিকে ছোটেন। এছাড়া চিকিৎসার জন্য অর্থবিত্তে সামর্থ্যবানরা তাই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা সিঙ্গাপুরথাইল্যান্ডের দিকে ছোটেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, নগরীর গোঁয়াছি বাগান এলাকায় বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই হাসপাতালটি নির্মিত হলে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের আর ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এছাড়া ১৫ তলা বিশিষ্ট বিশেষায়িত ক্যান্সার ভবনের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। একই ভবনে হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধাও থাকছে। যেখানে অন্তত ৫০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সুবিধাও যুক্ত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় থেমে নেই; এটি সরাসরি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে গভীর করছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন সরাসরি মানুষের পকেট থেকে আসে, তখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠানের সীমিত প্রস্তুতি, মানবসম্পদের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের প্রায় অর্ধেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত নয়এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত অবহেলার ফল। স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটই এ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বমান অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য যেখানে ৪৪ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮ জনের কিছু বেশি। এই ঘাটতি কেবল সংখ্যার নয়; দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সুষম বণ্টনের অভাবও এতে যুক্ত। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসামঞ্জস্য এবং শূন্য পদের দীর্ঘদিনের অবহেলা মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। টিকাদান ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে ফল আসতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। উন্নতির পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নাগরিকের আস্থাকে শক্তিশালী করে। সবর্জনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে