রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন

শাহিদা জাহান | শনিবার , ২৮ মার্চ, ২০২৬ at ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে নারী কখনোই নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। তাঁর শ্রম, মেধা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অদৃশ্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কালের পরিবর্তনে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে নারীর ভূমিকা অনেক সময় অবমূল্যায়িত বা আড়াল করা হয়েছে, তবু পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা, শিল্প ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান স্পষ্ট ও অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হলেও নারী নানাবিধ সামাজিক পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে নারীকে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা ছিল প্রবল। তবু সংকটময় সময়ে তাঁদের সক্ষমতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যসংগ্রহ ও সংগঠনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুরু হলেও দীর্ঘদিন তাঁকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। সুযোগ পেলে নারীরা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এ সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের মূল ভিত্তি। শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের সুযোগ দেয় না, এটি সমালোচনামূলক চিন্তা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা গড়ে তোলে। বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের সক্রিয়তা বেড়েছে।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল পদ বা সংরক্ষিত আসনে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল স্রোতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে, তবে উপস্থিতি ও প্রভাব এক বিষয় নয়। অনেক সময় নারীকে প্রতীকী অবস্থানে রাখা হলেও ক্ষমতার কাঠামো পুরুষকেন্দ্রিক থেকে যায়। নারী সংখ্যা নয়, বরং নীতিনির্ধারণের নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হন, তখনই প্রকৃত অগ্রগতি ঘটে।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ, গ্রামীণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ সহায়তা নারীর স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করেছে। উদ্যোক্তা নারীরা শুধু পারিবারিক উন্নয়নেই নয়, জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছেন। কৃষি, প্রযুক্তি ও শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের সংবিধান নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করলেও সামাজিক মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পূর্ণ অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পেলেও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর প্রভাব পর্যাপ্ত নয়। সামাজিক কুৎসা, রাজনৈতিক সহিংসতা, চরিত্রহনন, সাইবার বুলিং ও পারিবারিক সন্দেহজনিত মনোভাব নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে নারীদের দ্বিমুখী সংগ্রাম করতে হয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সামাজিক পূর্বধারণার বিরুদ্ধে। আইনগত অগ্রগতি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারীর ক্ষমতায়নকে টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। United Nation ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা SDGsএর পঞ্চম লক্ষ্য নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে কেবল নীতিগত অঙ্গীকার নয়, প্রয়োজন নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ, জেন্ডারসংবেদনশীল বাজেট, তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন।

রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হলেও ইতিহাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ আসন দীর্ঘদিন পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। একজন নারীকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হলে আদর্শের পাশাপাশি কুসংস্কার ও কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। এই প্রতিকূলতা অতিক্রম করে যখন কোনো নারী সংসদ বা স্থানীয় সরকারে কথা বলেন, তখন তিনি অসংখ্য তরুণীর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন। নারী নেতৃত্ব আলোচনাভিত্তিক সমাধান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেয়।

অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন মানে কেবল কর্মসংস্থান নয়, সম্পদের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ঘরের ভেতরে নারীর গৃহস্থালি শ্রম এখনো জাতীয় আয়, এউচএ অন্তর্ভুক্ত নয়। এই ‘অদৃশ্য শ্রম’ ও ‘কেয়ার ইকোনমি’ জাতীয় অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ, এর স্বীকৃতি ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি পূর্ণতা পায় না। ক্ষুদ্রঋণ থেকে করপোরেট প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নারীরা তাঁদের সক্ষমতা প্রমাণ করছেন। তাঁদের আয় পরিবারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে বিনিয়োগ হয়, যা একটি সুস্থ ও শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলে।

এখনো ‘সমান কাজে সমান মজুরি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। করপোরেট জগতে উচ্চপদে নারীর অবস্থান ও তথাকথিত ‘গ্লাস সিলিং’ ভাঙার সংগ্রাম চলমান। তবে এই লড়াই কেবল নারীর নয়। এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ন্যায়ভিত্তিক পুনর্গঠনের দাবি। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর অবদান ব্যক্তি,পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, নেতৃত্বের সুযোগ ও সামাজিক স্বীকৃতি একত্রিত হলে সমাজ শক্তিশালী হয়। নারীর ক্ষমতায়ন দয়া নয়, অধিকার। এটি কোনো বিশেষ দিবসের স্লোগান নয়।

যে সমাজ নারীকে অবদমিত রাখে, সে সমাজ নিজের অর্ধেক সম্ভাবনাকেই অন্ধ করে রাখে। রাজনীতি ও অর্থনীতির দুই স্তম্ভে নারীর সমান ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। জাতির অগ্রযাত্রা কখনো একপাক্ষিক হতে পারে না, নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। বলা যায়, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক শর্ত। যে সমাজ নারীর সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেয় না, সে সমাজ নিজেই নিজের অর্ধেক শক্তিকে অস্বীকার করে। সমান অধিকার, সমান সুযোগ এবং কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে নয়। নারীর কণ্ঠস্বর যখন নীতিনির্ধারণে প্রতিধ্বনিত হবে, তাঁর শ্রম যখন অর্থনৈতিক মর্যাদা পাবে, তখনই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে মানবিক ও টেকসই হয়ে উঠবে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, ন্যায়, সমতা ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। আর সেই প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রে নারীকে সমান অংশীদার করাই ভবিষ্যতের সভ্যতার সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি একটি প্রগতিশীল সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে।

নারীর পদচারণা যত দৃঢ় হবে, রাষ্ট্রের ভিত্তি তত শক্তিশালী হবে, কারণ জাতির অগ্রযাত্রা কখনো একপাক্ষিক হতে পারে না। সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের জন্য নারীকে শুধুমাত্র “নারী’ হিসেবে নয়, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। লিঙ্গভিত্তিক ধারণা ও সামাজিক শর্তগুলো নারীর সৃজনশীলতা, নেতৃত্বদক্ষতা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করে। এক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল একটি নৈতিক বা ন্যায়িক দাবি নয়, এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত। নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হলো তার শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্বে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা। নারীকে সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তার উদ্ভাবনী শক্তি ও দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে নারীর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনমূলক কার্যক্রমের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সমৃদ্ধ ও সমন্বিত হয়। একজন নারী শুধুমাত্র নারী বিষয়ের প্রতিনিধি নয়, সে একজন মানব হিসেবে সমাজের বিভিন্ন দিককে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। ফলে, সমাজে বৈষম্য কমে, নীতি গ্রহণের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়। নারীর ক্ষমতায়ন অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়। নারী অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করলে নতুন উদ্যোগ, উদ্যোক্তা শক্তি এবং বাজারের গতি বৃদ্ধি পায়। নারী বলে তাকে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশের মানবসম্পদ ক্ষয় হয়। নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। সর্বশেষে বলা যায়, নারীর মানবিক স্বীকৃতি এবং ক্ষমতায়ন কেবল একটি সামাজিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং সমন্বিত সমাজ, রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। নারীর প্রতি লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিলে, সমাজ তার পুরো মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে সক্ষম হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
পরবর্তী নিবন্ধশত উপায়ে জ্বালাই তোমায়!