আবারও খেলার মাঠে মেলা আয়োজন

পাহাড়তলী রেলওয়ের শাহাজান মাঠ ও পলোগ্রাউন্ড মাঠে আগামী মাস থেকে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী দুইটি মেলা, নগরবাসীর ক্ষোভ । এ ধরনের কাজ থেকে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষের বিরত থাকা উচিত : মেয়র

মোরশেদ তালুকদার | বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

খেলার মাঠে মেলা বন্ধের দাবি দীর্ঘদিনের। খেলার মাঠে মেলার অনুমতি না দেয়ার দাবিতে নগরে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছেন সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠকরা। এসব দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে কাজীর দেউড়ি আউটার স্টেডিয়াম থেকে ‘বিজয় মেলা’ স্থানান্তর করা হয় সিআরবি চত্বরে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘পলোগ্রাউন্ড মাঠ কেবলই খেলার জন্য সংরক্ষিত’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয় মাঠের মালিক রেলওয়ে। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন নগরবাসী। কিন্তু বছর না ঘুরতেই আবারও নগরে খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

জানা গেছে, নগরের দুটি মাঠে আগামী মাস থেকে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী দুইটি মেলা। এর মধ্যে পাহাড়তলী রেলওয়ের শাহাজান মাঠে ৫ এপ্রিল শুরু হবে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা’। এ মেলার আয়োজক ‘এএমএসপি এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতষ্ঠান। এছাড়া পলোগ্রাউন্ড মাঠে ১০ এপ্রিল থেকে মাসব্যাপী ‘১৫তম আন্তর্জাতিক উইম্যান এসএমই এক্সপো বাংলাদেশ২০২৬’ শীর্ষক মেলা আয়োজন করছে চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। মাঠ দুটির মালিক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। মেলার আয়োজকরা জানিয়েছেন, তারা রেলওয়ে থেকে মাঠের বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও মেলা আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে। মাঠ দুটিতে মেলার স্টল নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এএমএসপি এন্টারপ্রাইজকে রেলওয়ে শাহজাহান মাঠে আগামী ৫ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা প্রদর্শনী আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৫ মার্চ ১৩ শর্তে এ অনুমতি দেয়া হয়। এদিকে এএমএসপি এন্টারপ্রাইজ সূত্রে জানা গেছে, মেলায় ১৫১টি স্টল বরাদ্দ দেয়া হবে। এর সাথে ট্রেন, নৌকা ও নাগরদোলা; এ জাতীয় কিছু বিনোদন রাইডস থাকবে। থাকবে খাবারের দোকান। মেলায় প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে ২০ টাকা মূল্যের টিকেট কিনতে হবে।

এদিকে গত ১০ মার্চ বাাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে ১০ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত ‘১৫তম আন্তর্জাতিক উইম্যান এসএমই এঙপো বাংলাদেশ২০২৬’ শীর্ষক মেলা আয়োজনের অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতেও ১৩ শর্ত দেয়া হয়। জানা গেছে, ২০২২ সালে চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি তাদের এ মেলা আয়োজন করে শাহাজাহান মাঠে। এছাড়া সংগঠনটি সর্বশেষ ২০২৪ সালে এপ্রিল মাষে পলোগ্রাউন্ড মাঠে ‘১৪তম আর্ন্তজাতিক উইম্যান এসএমই এঙপো’ আয়োজন করে।

এদিকে খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, একসময় সারা বছরের কোনো না কোনো সময় খেলার মাঠ দখলে থাকত মেলার। এর মধ্যে পলোগ্রাউন্ড মাঠ, হালিশহর আবাহনী মাঠ, আউটার স্টেডিয়াম ও শাহাজাহান মাঠ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর মাঠগুলোতে মেলা আয়োজন করা হয়নি। এতে নগরবাসীর বিশ্বাস জন্মে, এ ধারা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের অল্প সময়ের ব্যবধানে পূর্বের ন্যায় আবারও খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের সংস্কৃতিতে ফিরে আসায় তারা হতাশ।

খেলার মাঠে মেলা আয়োজন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, যে সব মাঠে আমাদের বাচ্চারা, বিশেষ করে শিশুকিশোররা খেলে ওই মাঠগুলো মেলার জন্য বরাদ্দ না দেয়ায় ভালো। মাঠগুলো খেলার জন্যই রাখা হলে বিনোদনের সুযোগ তৈরি হবে, কিশোরযুবকরা সেখানে খেলাধূলা করতে পারবে, এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটবে। তাই আমি মনে করি খেলার মাঠ মেলার জন্য অনুমোদন না দেয়ায় ভালো। এ ধরনের কাজ থেকে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষের বিরত থাকা উচিত বলে মনে করি। যারাই এটা করে (বরাদ্দ দেয়), রেলওয়ে বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষ তাদের এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া উচিত বলে মনে করি।

ক্রীড়া সংগঠক ও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর মো. হাফিজুর রহমান আজাদীকে বলেন, শুধু রেলওয়ে শাহজাহান মাঠ না, সব মাঠের ব্যাপারে বলবখেলার মাঠে শুধু খেলা হবে। আমরা খেলার মাঠগুলোকে ধ্বংস করে দিছি। চট্টগ্রাম শহরে ক্লিনিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি, ক্লিনিকের সংখ্যা কমাতে হলে মাঠগুলোতে খেলা ছাড়া অন্য কিছু করতে দেয়া যাবে না।

খেলার মাঠ মেলার জন্য বরাদ্দ দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিভিশনাল স্পোর্টস এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সম্পাদক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন গতকাল দুপুরে আজাদীকে বলেন, এএমএসপি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শাহজাহান মাঠে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা করার জন্য আমাদের কাছে মাঠ ব্যবহারের অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। আমরা এখনো তাদেরকে অনুমতি দেইনি। তারা মাঠ বরাদ্দের ভাড়া বাবদ পে অর্ডার নিয়ে আসার কথা ছিল, এখনো আসেনি।

এএমএসপি এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্ত্বাধিকারী এম এম মোশাররফ হোসেন আজাদীকে বলেন, প্রথমে রেলওয়ে থেকে মাঠ বরাদ্দ নিয়েছিলাম। এটাসহ যত ধরনের পেপার আছে সবগুলো দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাবমিট করেছি। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয়। এ মেলাটা কিন্তু নির্বাচনের আগে হওয়ার কথা ছিল, নির্বাচনের জন্য পিছিয়েছে। এসময় রেলওয়ে থেকে অনুমতি না দেয়ার দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, এটা ভুল বলেছেন। মাঠের বরাদ্দ ছাড়া তো মন্ত্রণালয় কখনো অনুমতি দেবে না। একটা মেলার অনুমতির জন্য প্রথমে অবশ্যই মাঠ বরাদ্দ লাগে।

মেলার স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, এখনো সব স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ৬০৭০টার মত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আমরা ১৫১টি স্টলের স্ট্রাকচার করছি। ‘বলছেন, আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য মেলা। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের ব্যবসায়ীদের স্টল থাকবে?’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাইরে থেকে আমরা আহ্বান করেছি। পাকিস্তানি দুইচারটা স্টল আসার কথা।

খেলার মাঠে মেলা আয়োজন নিয়ে নগরবাসী সবসময় আপত্তি জানায়। এরপরও খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের কারণ’ জানতে চাইলে এম এম মোশাররফ হোসেন বলেন, এটা কিন্তু রেলওয়ে ক্রীড়া পরিষদএর মাঠ। সারা বছরই এখানে খেলাধূলার হয়, শুধু বছরে একবার ওনারা ফান্ডএর জন্য মাঠ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। আসলে খেলাধূলার জন্য যত কিছুই করা হোক সবকিছুর সাথে কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। খেলোয়াড়দের পেছনে খরচ, বা খেলাধূলা আয়োজনের জন্য তো স্পন্সর লাগে। যার কারণে ফান্ড কালেকশনের জন্য ওনারা বছরে একবার মাঠটি ভাড়া দিয়ে থাকে। সেভাবেই আমাদের দিয়েছে। উনাদের ফান্ডে সাড়ে ৪ লাখ টাকার পেঅর্ডার দিয়েছি।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম শহরের সব খেলার মাঠে মেলা বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নেতারা। এর আগে খেলার মাঠ মেলার অনুমতি বন্ধের দাবিতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে হালিশহর আবাহনী মাঠ প্রাঙ্গণে হালিশহর সচেতন নাগরিক সমাজের উদ্যোগে মানববন্ধন আয়োজন করে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে যাত্রী নিয়ে বাস পড়ে গেল পদ্মায়, ১৬ মরদেহ উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে নাপিত্তা ঝরনার কূপে মিলল পর্যটকের লাশ