মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখার কথা বলছে দেশটি। পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলও। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেছেন, তেহরান এখন পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি কিংবা সমঝোতার জন্য অনুরোধ করেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আমেরিকানদের সঙ্গে কেন কথা বলব? কথা বলার কোনো কারণ দেখি না। কারণ আমরা যখন তাদের সঙ্গে আলোচনায় ছিলাম, তখনই তারা আমাদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি আরও বলেন, এই সংঘাত মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ফল। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের বাধানো যুদ্ধ। আমরা আমাদের আত্মরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাব। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান একটি চুক্তি চায়; তবে তিনি সেটিতে রাজি নন। তার ভাষ্য ছিল, ইরানের দেওয়া শর্তাবলী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। বাহিনীটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে ধাওয়া করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এই হুমকি সামপ্রতিক এক মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া। সেখানে নেতানিয়াহু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতা নাইম কাশেমের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে অস্বীকার করেছিলেন। সংঘাতের দুই সপ্তাহ আগে তেহরানে চালানো এক হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর তার দ্বিতীয় পুত্র মুজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী–আইআরজিসি। তাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানের লক্ষ্যবস্তুতে ৫৪টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই হামলায় খোররামশাহর সুপার–হেভি ক্ষেপণাস্ত্র, খায়বার–শাখান, কদর এবং এমাদ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ‘সেজিল’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ইরানি সামরিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সেজিল একটি মাঝারি পাল্লার সারফেস–টু–সারফেস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে ইসরায়েলের তেল আভিভ পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় সাত মিনিটে অতিক্রম করতে সক্ষম।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। আগের হামলার খবর আসার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই নতুন হামলার ঘটনা ঘটে। নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, তেল আভিভের বিভিন্ন এলাকায় ক্লাস্টার বোমা বা গুচ্ছ বোমা পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছাড়া অন্য সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। তিনি জানান, অনেক ট্যাঙ্কার ও জাহাজ এখনো ওই পথ দিয়ে চলাচল করছে, যদিও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে কেউ কেউ বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ এ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫০০ মেরিন সেনা এবং একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলার পরিধি বাড়াচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ বলেছে, পশ্চিম ও মধ্য ইরানের আরও কয়েকটি নতুন এলাকা এখন হামলার আওতায় আনা হয়েছে। আইডিএফের দাবি, এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরান সরকারের কমান্ড ও কন্ট্রোল বা সামরিক নির্দেশনা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। তারা জানিয়েছে, পশ্চিম ইরানের হামদান এলাকায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং বাসিজ বাহিনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সদর দপ্তরে হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৮২৬ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। হামলার কারণে অন্তত পাঁচটি হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইরান সরকার বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের দেশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত হামলায় ২০০–এর বেশি ছাত্র ও শিক্ষক নিহত হয়েছেন এবং ১২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ৪২ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি হামলা বাড়ায়, তাহলে অঞ্চলে থাকা তাদের সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরাসরি হামলার পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদেরও সক্রিয় করতে পারে। এর মধ্যে লেবাননের হেজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাক–সিরিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি ঘাঁটি ইতোমধ্যে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। এদিকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস তার প্রধান মিত্র ইরানকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। গত শনিবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলছে, ‘ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রক্ষায়’ এ অঞ্চলের সকল জাতির সহযোগিতা করা উচিত। তেহরান–সমর্থিত হামাসের এ আহ্বানকে ‘বিরল অনুরোধ’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে হামাস এও বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই তেল এশিয়া–ওশেনিয়া অঞ্চলে দ্রুত সরবরাহ করা হবে এবং মার্চের শেষ নাগাদ ইউরোপ ও আমেরিকায় পৌঁছাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সামরিক প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে।












