ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ হামলার শিকার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোরের সাথে যুক্ত ফার্স নিউজ এজেন্সি। সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, মার্কিন হামলার সময় দ্বীপটিতে ১৫টির বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। এ সময় দ্বীপটিতে থাকা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌ ঘাঁটি, বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার এবং একটি হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। তবে সেখানকার তেল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি। এ হামলার পর আইআরজিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে বলেছে, সেখানে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন থেকে ইরানের জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু। ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনগণকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর এবং ফুজাইরাহ বন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। তেহরান এই স্থাপনাগুলি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলার শিকার হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। খবর বিবিসি বাংলা ও বিডিনিউজের।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো ২৫০০ মেরিন সেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এই সিদ্ধান্তকে বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
খারগ দ্বীপে বোমা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের : মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ১৫তম দিনে এসে ইরানের জ্বালানি খাতের ‘হৃদপিণ্ড’ খার্ক দ্বীপে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। শুক্রবারের এই হামলা পুরো অঞ্চলকে এক চরম উত্তেজনার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার বাহিনী ইরানের প্রধান তেলের হাব খারগ দ্বীপের সব সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে; তেহরান যদি এর পরও হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলে কোনো ধরনের বাধা দেয়, তাহলে পরবর্তীতে দ্বীপটির তেল স্থাপনাতেও হামলা হবে।
সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, শুক্রবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি ওই দ্বীপটির প্রত্যেক সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিলেও তেল স্থাপনা অক্ষত রেখেছে। এরপরও ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ যাত্রায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে তাহলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবো, পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ কথা লেখেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আগের দিনই ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে বলেছিলেন, খারগের তেল স্থাপনায় কোনো হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে অন্য মাত্রার।
আবুধাবি ও দুবাইয়ের বন্দর এলাকা খালি করার আহ্বান : ইরানের আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনগণকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর এবং ফুজাইরাহ বন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেছে তেহরান। তাসনিমের খবরে বলা হয়, এই এলাকাগুলি ইরানের হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে, কারণ এখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী বেসামরিক স্থাপনাগুলির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। এই স্থাপনাগুলি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলার শিকার হতে পারে।
ইরানের খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আইআরজিসি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে বলেছে, সেখানে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন থেকে ইরানের জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু। গতকাল শনিবার আইআরজিসির এ হুঁশিয়ারির মধ্যে আরব আমিরাতে ড্রোন হামলা হয়েছে। একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর ফুজাইরাহ তেল শিল্পাঞ্চলে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে ২৫০০ মেরিন সেনা : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আড়াই হাজার মেরিন সেনা ও একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আদেশ দিয়েছে। শুক্রবার মার্কিন এক কর্মকর্তা নিউ ইয়র্কভিত্তিক এক বার্তা সংস্থাকে এ আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দুই সপ্তাহের মাথায় অঞ্চলটিতে এত সেনা ও উভচর জাহাজ মোতায়েন সংঘাতের তীব্রতা বাড়ারই ইঙ্গিত দিয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। মেরিন সেনা মোতায়েনের খবর আসার কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তার বাহিনী ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খারগ দ্বীপে থাকা সব সামরিক লক্ষ্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা না রাখলে এরপর খারকের তেল স্থাপনায়ও হামলা হবে, বলেছেন তিনি।
বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস হামলা : ইরাকি রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ভবনে শুক্রবার হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। যদিও এই ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া হামলার ধরন এবং কারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত সেটিও পুরোপুরে নিশ্চিত নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে যে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র দূতাবাসে আঘাত করেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ভবনে একটি রকেট আঘাত হানে, যার ফলে সেখান থেকে ধোঁয়া উড়তে থাকে, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির দাবি, ড্রোন হামলার ফলেই দূতাবাস ভবনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি বলছে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে একটি হামলায় ইরান–সমর্থিত দুই যোদ্ধা নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সেখানকার মার্কিন দূতাবাসে এই হামলা চালানো হয়।
ইরানে ৬ মাসের শিশুসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিহত : ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ৬ মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি আবাসিক ভবনে ওই হামলা চালানো হয়। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
যে–কোনো উপায়ে হরমুজ খুলবে যুক্তরাষ্ট্র : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালি যেভাবেই হোক যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত করবে বলে হুঁশিয়ার দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যেভাবেই হোক, আমরা শিগগিরই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত, নিরাপদ ও মুক্ত করব।
ট্রুথ সোশালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি আশাবাদী চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে, যাতে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো হুমকি হয়ে না থাকে। গুরুত্বপূর্ণ শিপিং চ্যানেলটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে অনেক দেশই যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।
ইসরায়েলে পরপর দুটি হামলা ইরানের : বিবিসি জানিয়েছে, আধা ঘণ্টার মধ্যে হামলার দুটি হালনাগাদ তথ্য দিয়েছে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তারা বলছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে এক ঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলেছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে নতুন এক দফার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
তেহরানের এই হামলার পর তেল আবিব শহরে বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী তাদের জনগণকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তেল আবিব ও মধ্য ইসরায়েল জুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়েছে।
সৌদি আরবে ৫টি মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত : ইরানের হামলায় সৌদি আরবের একটি বিমান ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর ৫টি রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট বা জ্বালানি ভরার বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ওই ৫টি বিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, এখন সেগুলোর মেরামতকাজ চলছে, অনামা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে শুক্রবার এ খবর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি। তাদের এ প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ হামলা হয়েছে বললেও ক্ষেপণাস্ত্র না ড্রোনে বিমানগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানায়নি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।












