ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকা পড়েছে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, তাতে ১৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের আয় হারিয়েছে উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। ২০২৫ সালের গড় দাম ও পরিমাণের হিসাব কষে বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার বলছে, এ প্রণালি দিয়ে একদিনে সাধারণত প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন হয়। খবর বিডিনিউজের।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হলে ইরান হরমুজ দিয়ে চলাচল করা জাহাজেও হামলা শুরু করে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের মধ্যে জাহাজের বীমা খরচও অনেক বেড়ে গেছে। এই বিপুল রাজস্ব ক্ষতি দেখিয়ে দিচ্ছে, এসব উপসাগরীয় দেশ পণ্য রপ্তানির ওপর কতটা নির্ভরশীল, তাদের জন্য যুদ্ধের আর্থিক মূল্য কত বড়। কেপলারের ফ্লোরিয়ান গ্রুয়েনবার্গার বলেন, যুদ্ধের আগে এ জলপথে যে পরিমাণ জাহাজ চলাচল ছিল, সেই তুলনায় এখন চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। আটকে পড়া চালানের বেশিরভাগই অপরিশোধিত তেল, যার মূল্য মোট আর্থিক ক্ষতির ৭১ শতাংশ। সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শ সেবার প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হারিয়েছে। তবে আগামী দিনে তারা লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
উড ম্যাকেঞ্জির অর্থনীতি বিভাগের প্রধান পিটার মার্টিন বলেছেন, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি ইরাক, কারণ দেশটির সরকারি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল থেকে আসে। কুয়েত ও কাতারও ঝুঁকিতে আছে, তবে এই দুই দেশের বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে প্রভাব সামাল দিতে পারে। কেপলার জানিয়েছে, অন্তত ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দামের তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালির ভেতর আটকে আছে। জাহাজে থাকা এসব পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। কিছু কার্গো যুদ্ধের আগেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বিক্রি করা হয়েছিল।
তাই এগুলো থেকে এখনও আয় হতে পারে, কারণ সাধারণত পণ্য জাহাজে তোলার ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, জ্বালানি বাণিজ্যে এই বিঘ্নের প্রভাব উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভিন্ন হতে পারে। ইরাকের ক্ষতির শঙ্কা বেশি দেখছেন স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ কোম্পানি কাইরোস’র সহ–প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্টোয়ান হাল্ফ। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরাকের তুলনায় সৌদি আরব ভালো অবস্থানে রয়েছে।
অ্যান্টোয়ান হাল্ফ বলেন, সৌদি আরব বিদেশের সংরক্ষণাগারেও তেল মজুদ রাখে, সে কারণে কিছু সময় পর্যন্ত তারা গ্রাহকদের সরবরাহ চালিয়ে যেতে পারবে। একইসঙ্গে তেলের উচ্চ দামও হারানো রপ্তানি আয়ের কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, আদতে তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে গাড়িচালক এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সৌদি আরামকো বলেছে, তারা পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ তেল পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠাতে পারবে। তবে এ পাইপলাইনে এত বেশি তেল আগে কখনও পরিবহন না করায় সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশগুলো মোট প্রায় ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রি ও শুল্ক আয় স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি ২ মার্চ উৎপাদন বন্ধ করার পর বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৫৭১ মিলিয়ন ডলার আয় হারিয়েছে। ভবিষ্যতের নতুন প্রকল্প বা সমপ্রসারণ বিলম্বের ক্ষতি এখানে ধরা হয়নি।










